রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি ফলের বাজার বাদামতলীতে সরকারি নির্ধারিত পার্কিং ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ এখনো বন্ধ হয়নি। গত আগস্টে বিষয়টি সামনে আসার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অক্টোবরের শেষ দিকে প্রকাশিত ফলোআপ প্রতিবেদনে চালক ও ব্যবসায়ীদের একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত হার অনুযায়ী, বাদামতলী ঘাটসংলগ্ন পার্কিং ইয়ার্ডে একটি ট্রাকের জন্য প্রতি তিন ঘণ্টার পার্কিং ফি ১০০ টাকা। অথচ চালক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পার্কিং, ফল খালাস এবং গাড়ি থেকে ফল বিক্রির নামে তাঁদের কাছ থেকে একাধিক ধাপে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
১৬ আগস্ট প্রকাশিত মূল অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠে আসে, একটি ট্রাক থেকে বিভিন্ন খাতে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছিল। এরপর ৩০ অক্টোবরের ফলোআপ প্রতিবেদনেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ অব্যাহত থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
সর্বশেষ প্রতিবেদনে নিয়মিত বাজারে আসা পিকআপচালক আহমেদ আলী জানান, এক থেকে দেড় ঘণ্টা গাড়ি রাখার জন্য তাঁকে ২০০ টাকা দিতে হয়। তবে যেসব চালক নিয়মিত আসেন না বা টাকা আদায়কারীদের পরিচিত নন, তাঁদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিম ফ্রুটসের ব্যবসায়ী মফিজ উদ্দিনের অভিযোগ, চট্টগ্রাম থেকে কমলা নিয়ে আসা একটি ট্রাকের ফল বাজারে বিক্রির জন্য ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। ফল নামানোর পর গাড়িটি পার্কিংয়ে রাখার জন্য আরও ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
এতে দেখা যাচ্ছে, নির্ধারিত পার্কিং ফির পাশাপাশি ফল বিক্রির নামেও আলাদা অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে ফল বিক্রির জন্য দাবি করা অর্থকে সরাসরি সরকারি পার্কিং ফির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কোন খাতে কত টাকা আদায়ের আইনগত অনুমোদন রয়েছে, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
আগস্টে অভিযোগ প্রকাশের পর বাদামতলী ও ওয়াইজঘাটের মধ্যবর্তী সড়কে অবৈধভাবে গাড়ি দাঁড় করানোর বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। সকাল ৯টার পর অবৈধভাবে পার্কিং করা ট্রাকের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ায় অনেক চালক আগেভাগে গাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন অথবা নির্ধারিত পার্কিং এলাকায় যাচ্ছেন। ফলে আগের তুলনায় সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের সংখ্যা কমেছে।
এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ ট্রাক, লরি ও পিকআপের অনুমোদিত পার্কিং ফি উল্লেখ করে সাইনবোর্ড স্থাপন করেছে। কিন্তু চালকদের অভিযোগ, সাইনবোর্ড বসানো হলেও বাস্তবে তাঁদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
এদিকে গত ২৫ আগস্ট ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বাদামতলী বাজারসংলগ্ন অবৈধ পার্কিং ও অননুমোদিত দোকানপাট সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। যানজট ও অবৈধ স্থাপনা সমস্যার সমাধানে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চাওয়ার পর এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পার্কিং ইয়ার্ডের ইজারা ও পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইজারা এখনো করিম হাজীর নামে রয়েছে। তবে স্থানীয় শ্রমিক দল নেতা সুমন ভূঁইয়ার নিয়ন্ত্রণে পার্কিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আগের প্রতিবেদনে সুমন ভূঁইয়া অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, তিনি নিয়মিত ইজারার অর্থ পরিশোধ করছেন এবং অনেকে নিজেদের স্বার্থে তাঁর নাম ব্যবহার করছেন।
বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. মোবারক হোসেন মজুমদার জানিয়েছেন, অনুমোদিত হারের বাইরে কোনো অর্থ আদায় করা যাবে না। নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলে চালক ও ব্যবসায়ীদের লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ জানিয়েছেন, নিয়মিত বাদামতলী বাজারে পণ্য আনা-নেওয়ার কারণে তাঁরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে ভয় পান। তাঁদের আশঙ্কা, টাকা আদায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে পরবর্তী সময়ে ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
বাদামতলীর মতো বড় পাইকারি বাজারে পরিবহন ও পণ্য খালাসের ব্যয় সরাসরি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ফলে অনুমোদিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ফলের বাজারমূল্যেও পড়তে পারে।
দুই মাসের ব্যবধানে সড়কের অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণে কিছু পরিবর্তন এলেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ থেকে যাওয়ায় তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অনুমোদিত ফি প্রকাশ্যে কার্যকর রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত চালক ও ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা।




