খুলনা মহানগরীর রায়েরমহল এলাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় নিহত হয়েছেন মহানগর জাতীয়তাবাদী তাঁতীদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবির (৫২)। রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রায়েরমহল বড় মসজিদের পেছনে এ ঘটনা ঘটে। ফ্রিজের বকেয়া টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, সন্ধ্যায় নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বসে ছিলেন হুমায়ুন কবির। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে তাঁর ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে, যার মধ্যে বুকে গুরুতর জখম হয়।

পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফ্রিজের ১০ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে খুলনার মোস্তফার মোড় এলাকার একটি দোকান থেকে কিস্তিতে একটি ফ্রিজ কিনেছিলেন হুমায়ুন কবির। ফ্রিজটির প্রায় ১০ হাজার টাকা বকেয়া ছিল।

রোববার বিকেলে দোকানমালিক আরাফাত ও তাঁর ভাই ওই টাকা চাইতে হুমায়ুনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যান। এ সময় তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এর কিছুক্ষণ পর সহযোগীদের নিয়ে ফিরে এসে হুমায়ুনের ওপর হামলা চালানো হয়।

আড়ংঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হালিমুর রহমান জানান, ফ্রিজের কিস্তির টাকা আদায় নিয়ে বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে এর পেছনে অন্য কোনো বিরোধ বা কারণ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে পরিবারের অভিযোগ

হামলার ঘটনায় স্থানীয় ছাত্রদলের এক নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজনেরা। হাসপাতালে হুমায়ুন কবিরের ভাতিজা সৈয়দ দিদারুল আলম বিপ্লব অভিযোগ করেন, নগরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্রদল নেতা আরাফাতের নেতৃত্বে তাঁর চাচার ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

তবে এটি পরিবারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগ। তদন্তের মাধ্যমে হামলায় কারা জড়িত এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী, তা নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে।

খুলনা মহানগর তাঁতীদলের আহ্বায়ক আবু সাঈদও জানিয়েছেন, হুমায়ুন কবির সংগঠনটির মহানগর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

হত্যা মামলা, একজন গ্রেপ্তার

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছেলে সৈয়দ নুর আমিন সৌহার্দ্য বাদী হয়ে রোববার রাতে আড়ংঘাটা থানায় মামলা করেছেন। মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।

সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানায়, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি শেখ সিদ্দিক (৫৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আড়ংঘাটা থানার ওসি মো. হালিমুর রহমান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা আরাফাতসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ

খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার গোপী কিশোর রায় জানান, হামলার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। নিহতের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনার তদন্তে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।

ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তদন্তের স্বার্থে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ।

এদিকে হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা, তাঁদের ভূমিকা এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে পাওনা টাকার বিরোধ

প্রাথমিকভাবে ফ্রিজের বকেয়া টাকা নিয়ে বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ। তবে শুধু এই বিরোধই হত্যার একমাত্র কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

মামলার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং বাকি অভিযুক্তদের আটক করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।