বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত, কিন্তু সেই চাপ সামলানোর মতো পরিবেশ নেই। দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতিতে টার্মিনালজুড়ে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। বৃষ্টি নামলেই সেগুলো কাদা ও পানিতে ভরে যায়। যাত্রীদের অপেক্ষার জায়গা, পানি ও আলোর ব্যবস্থাও কার্যকর নেই বলে সর্বশেষ সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দ্য ডেইলি স্টারের ১১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ব্যবহার করেন। তবে যাত্রীসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কিছুটা ভিন্ন হিসাবও পাওয়া গেছে। সেপ্টেম্বরের আরেকটি স্থানীয় প্রতিবেদনে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার যাত্রীর কথা বলা হয়েছে, আর ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ছিল ১৭ থেকে ২১ হাজার। কোনো হালনাগাদ সরকারি দৈনিক যাত্রী গণনা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

বর্তমান টার্মিনালটি প্রায় দুই একর জায়গার ওপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর নির্মাণ করেছিল প্রায় দুই দশক আগে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে নির্মাণের সাল ২০০৪ উল্লেখ করা হয়। এরপর বড় ধরনের আধুনিকায়ন না হওয়ায় বাড়তে থাকা বাস ও যাত্রীর চাপ সামলাতে অবকাঠামোটি ক্রমেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে।

সমস্যা শুধু ভাঙা সড়ক বা কাদায় সীমাবদ্ধ নয়। সর্বশেষ সরেজমিন প্রতিবেদনে অপেক্ষার জায়গা, পানির ব্যবস্থা ও আলো অচল থাকার কথা উঠে এসেছে। টার্মিনালে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক বাসকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গায় কিংবা টার্মিনালের বাইরের সড়কের পাশে দাঁড়াতে হয়। এতে যাত্রী ওঠানামায় ভোগান্তির পাশাপাশি নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

২০২৫ সালের জুনেও একই সমস্যার চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। সে সময় টার্মিনালের বিভিন্ন অংশে বড় গর্ত, জলাবদ্ধতা এবং যাত্রী ছাউনির সংকটের কথা জানিয়েছিলেন পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীরা। অর্থাৎ এক বছরের বেশি সময় পরও মৌলিক সমস্যাগুলোর বড় অংশ রয়ে গেছে।

পরিবহন মালিকদের দাবি, টার্মিনাল থেকে নিয়মিত রাজস্ব পাচ্ছে বাগেরহাট পৌরসভা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পৌর কর ও টোল বাবদ প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় হয়। আন্তজেলা বাসের জন্য দৈনিক ৫০ টাকা এবং দূরপাল্লার বাসের জন্য ৮০ টাকা পৌর টোল দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাগেরহাট বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলামের অভিযোগ, নিয়মিত অর্থ পরিশোধের পরও টার্মিনালের প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। গর্ত ভরাটের জন্য প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রস্তাব পৌর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

বাসচালকদের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। বড় গর্তে বাস চলাচলের কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশ ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে। আবার পর্যাপ্ত আলো, সীমানাপ্রাচীর ও নিরাপত্তার অভাবে রাতে বাস ও সরঞ্জাম চুরির ঝুঁকির কথাও জানিয়েছেন চালকেরা।

পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকার সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় বাগেরহাটেও দূরপাল্লার বাস ও যাত্রীর চাপ বেড়েছে। ২০২৪ সালের হিসাবে জেলার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর ও বরিশালের সঙ্গে বাস চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু সেই বাড়তি চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টার্মিনালের আয়তন ও সুযোগ সুবিধা বাড়েনি।

টার্মিনাল উন্নয়নের উদ্যোগ অবশ্য একেবারে নেই, এমন নয়। গত ৫ এপ্রিল বাগেরহাটে Coastal City Climate Resilient Project এর আওতায় বাস টার্মিনালসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আধুনিক সুযোগ সুবিধা, যানজট কমানো এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয়।

সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মেজবাহ উদ্দিন জানিয়েছেন, টার্মিনালের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে। জমি অধিগ্রহণ শেষ হলে টার্মিনাল উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। বর্ষায় টার্মিনাল ব্যবহারযোগ্য রাখতে কিছু সাময়িক ব্যবস্থাও নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

এর আগেও কর্তৃপক্ষ সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছিল। ২০২৫ সালের জুনে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছিলেন, গর্তগুলো সাময়িকভাবে মেরামতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এসেও টার্মিনালের বেহাল অবস্থার চিত্র পাওয়া যাওয়ায় স্থায়ী উন্নয়নকাজ কবে দৃশ্যমান হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাগেরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এখন জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পরিবহন কেন্দ্র। যাত্রীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাবে কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রতিদিন যে হাজার হাজার মানুষ এই টার্মিনালের ওপর নির্ভর করেন, তা স্পষ্ট। ফলে জমি অধিগ্রহণ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কাদা, জলাবদ্ধতা, পার্কিং সংকট এবং ন্যূনতম যাত্রীসেবার ঘাটতিই তাদের দৈনন্দিন ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে থাকছে।