সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৩৬ নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS)। সংগঠনটির মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
HRSS জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে ২৩৬ নারী ও কন্যাশিশুর মধ্যে ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৭ জন শিশু ও কিশোরী। এছাড়া ১৩ নারী ও কিশোরী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ২৫ শিশুসহ ৪৯ জন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
ধর্ষণের পর পাঁচ নারী ও কন্যাশিশু নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু ও কিশোরী। এছাড়া ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর এক নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতায় ছয় নারী ও কিশোরী নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। এ ধরনের ঘটনার পর একজন আত্মহত্যা করেছেন বলেও জানিয়েছে HRSS। পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় আরও ৪৩ নারী নিহত, ২৭ জন আহত এবং ২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনের আরেক অংশে ২৭১ শিশুর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৮ জন মারা গেছে এবং ১৯৩ জন শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে; সাত শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
HRSS জানিয়েছে, তাদের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনটি দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্যসংগ্রহ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। ফলে এগুলো নথিভুক্ত ঘটনা; বাস্তবে আরও ঘটনা থাকতে পারে, যা সংগঠনের পর্যবেক্ষণের আওতায় আসেনি।
রাজনৈতিক সহিংসতাও আলোচনায়
সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক সহিংসতার ৬৮টি ঘটনায় অন্তত চারজন নিহত এবং ৫২৭ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে HRSS জানিয়েছে। আগস্টে ৭০টি ঘটনায় সাতজন নিহত ও ৫৩৬ জন আহত হওয়ার তুলনায় সেপ্টেম্বরে ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
HRSS-এর হিসাবে, সেপ্টেম্বরের ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে ৩৫টি ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধকেন্দ্রিক। এসব ঘটনায় ৩৪০ জন আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের মধ্যে সাতটি সংঘর্ষে ৬১ জন আহত হয়েছেন।
এছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ছয়টি সংঘর্ষে একজন নিহত ও ৪২ জন আহত হয়েছেন। জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দুটি সংঘর্ষে একজন নিহত ও তিনজন আহত এবং বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মধ্যে তিনটি সংঘর্ষে ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সীমান্তেও সহিংসতা
সেপ্টেম্বরে ২০টি ঘটনায় অন্তত ৩৫ সাংবাদিক হামলা বা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে HRSS-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬ জন আহত, ১২ জন হামলার শিকার এবং তিনজন হুমকি পেয়েছেন। একজন সাংবাদিক সাইবার নিরাপত্তা আইনে আটক হয়েছেন এবং তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৩৫টি ঘটনায় নয়জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনা ও নির্যাতনের অভিযোগে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য প্রতিবেদনে এসেছে।
সীমান্ত পরিস্থিতিতেও কয়েকটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হামলা-সংশ্লিষ্ট তিন ঘটনায় দুই বাংলাদেশি নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন বলে HRSS জানিয়েছে। একজনকে আটক করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ১০০ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।
HRSS-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, সেপ্টেম্বরে মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, ক্যাম্পাসে সংঘাত, মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সীমান্ত সহিংসতা অব্যাহত থাকায় তিনি উদ্বেগ জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনটি এমন সময়ে এসেছে, যখন চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা বৃদ্ধির তথ্য দিয়েছিল HRSS। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৬২১ নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি।
সেপ্টেম্বরের নতুন প্রতিবেদন তাই শুধু নারী ও শিশু নির্যাতনের সংখ্যাই নয়, একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মব সহিংসতা এবং সীমান্ত পরিস্থিতির মতো একাধিক মানবাধিকার ইস্যুর চিত্র সামনে এনেছে।
