ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ হেমায়েতপুরে এ কে এইচ (AKH) গ্রুপের একটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর চালান। পরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে হেমায়েতপুর ও আশপাশের কয়েকটি পোশাক কারখানায় দুপুরের দিকে ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে এ কে এইচ গ্রুপের একটি কারখানায় তখনো উৎপাদন কার্যক্রম চলছিল।

দুপুর আড়াইটার দিকে ছুটি পাওয়া আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের একটি দল ওই কারখানার সামনে গিয়ে কর্মরত শ্রমিকদের বেরিয়ে আসতে বলেন। কারখানার শ্রমিকেরা বের হতে রাজি না হওয়ায় এবং কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা না করায় বিক্ষোভকারীদের একাংশ কারখানার ভেতরে প্রবেশ করেন।

কারখানায় ভাঙচুর, নিরাপত্তা চৌকিতে আগুন

কারখানায় প্রবেশের পর বিক্ষোভকারীরা ভবনের কাচ, ভেতরে থাকা কয়েকটি গাড়ির জানালা ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করেন। কারখানার প্রধান ফটকের পাশে থাকা নিরাপত্তা চৌকিতেও আগুন দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ও কারখানার নিজস্ব কর্মীদের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

কারখানার এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে পাশের কারখানা থেকে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক এসে ফটকে ভাঙচুর চালান। পরে তাঁদের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ জনে পৌঁছায়। এ সময় কারখানার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীও হামলার শিকার হন বলে তিনি জানান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় একপর্যায়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ

কারখানার ঘটনার পর বিক্ষোভকারীরা হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নেন। বিকেল ৩টার দিকে শুরু হওয়া অবরোধে সড়কের দুই পাশে যানবাহন আটকে পড়ে। এতে ঢাকা ও আরিচাগামী যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম জানান, আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিক ও অন্য ব্যক্তিরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

পুলিশের হস্তক্ষেপে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়ক থেকে সরে যান বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ

বিক্ষোভ ও কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন প্রাইম টিভির সাভার উপজেলা প্রতিনিধি গোপাল মালাকার। আন্দোলনকারীদের কয়েকজন তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে সাভার মডেল থানার পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিভিন্ন স্থানে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, ঘটনায় শ্রমিক নাকি বহিরাগত ব্যক্তিরা জড়িত, তা তখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি, তবে ভাঙচুর হয়েছে। শ্রমিক, কারখানা মালিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান লক্ষ্য।

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি

আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকদের প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। পাশাপাশি শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা বন্ধ এবং অন্যান্য শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য।

শুধু হেমায়েতপুর নয়, রাজধানীর মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া এবং গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও একই দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ১ নভেম্বর সাভার ও আশুলিয়ার মোট ১৭৭টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নতুন মজুরি বোর্ড গঠন সরকারের

শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১ নভেম্বর পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সচিবালয়ে বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়ে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত সভা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু করা হবে।

বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। এতে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মন্ত্রী আরও জানান, শ্রমিকদের বৈধ দাবি পূরণ এবং শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখা, দুই বিষয়েই সরকার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

২ নভেম্বরও শিল্পাঞ্চলে উদ্বেগ

২ নভেম্বরের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোট ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত অসন্তোষ পুরোপুরি কাটবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

হেমায়েতপুরে এ কে এইচ গ্রুপের কারখানাকে ঘিরে সংঘটিত ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানিয়েছে। তবে শ্রমিকদের মূল দাবি বাস্তবায়ন এবং শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন সংশ্লিষ্ট সবার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।