উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধে অচল চুয়েট, বাড়ছে সংকট

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান অচলাবস্থা আরও জটিল হয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে অপসারণ এবং সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। একই দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে টানা ২০ দিনের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

সোমবার, ১২ অক্টোবর, নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে গিয়ে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কার্যালয় থাকা প্রশাসনিক ভবন বাইরে থেকে আটকে দেন। এ ঘটনার পর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংগঠনগুলো নতুন উপাচার্যের সঙ্গে অসহযোগের ঘোষণা দেয়।

নতুন উপাচার্যের প্রবেশ ঘিরে উত্তেজনা

দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টার দিকে ক্যাম্পাসে পৌঁছান অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। পরে তিনি তালাবদ্ধ উপাচার্য কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কার্যালয় থাকা ভবনের প্রবেশপথ বাইরে থেকে আটকে দেন। নতুন উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে তাঁরা স্লোগান দেন। দ্য ডেইলি স্টারের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা ভবনটির বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন করেন।

অসহযোগের ঘোষণা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের

নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারী সমিতি যৌথভাবে অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সোমবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা জানান, তাঁরা অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে উপাচার্য হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন না এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করবেন না।

শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। তাঁকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

২০ দিনের বেশি বন্ধ ক্লাস-পরীক্ষা

উপাচার্য নিয়োগের বিরোধে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনায়। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন পর্যন্ত টানা ২০ দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ ছিল। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত পত্রিকাটির আরেক প্রতিবেদনে আন্দোলনকে ২১তম দিনের অচলাবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘ সময় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পরীক্ষার সময়সূচি, সেমিস্টারের অগ্রগতি এবং শিক্ষাবর্ষের স্বাভাবিক ছন্দ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে ক্লাস-পরীক্ষা পুনরায় শুরুর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন কোনো নিশ্চিত সময়সূচি পাওয়া যায়নি।

৫৬ দিনের মাথায় পরিবর্তন করা হয় উপাচার্য

চুয়েটের সংকটের সূত্রপাত গত ২১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। অধ্যাপক সায়েম ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। অর্থাৎ দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এই পরিবর্তনের প্রতিবাদে ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। পরদিন থেকে তাঁরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করতে থাকেন। পরে একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচিতে যুক্ত হন।

বেতন-ভাতা নিয়েও তৈরি হয়েছিল জটিলতা

আন্দোলনের মধ্যে গত ৭ অক্টোবর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সেপ্টেম্বর মাসের বেতন ও উৎসব ভাতা নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন উপাচার্যের নির্দেশের পর ১ হাজার ৮৭ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন-ভাতা ছাড় সাময়িকভাবে আটকে যায়।

পরে কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে ওই দিনই বেতন ও ভাতা পরিশোধ শুরু হয়। ফলে প্রশাসনিক বিরোধের প্রভাব শুধু শিক্ষা কার্যক্রমেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক বিষয়েও পড়েছিল।

সমাধানের অপেক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়

১৩ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া সংবাদ অনুযায়ী, চুয়েটে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। নতুন উপাচার্যের পদত্যাগ ও সাবেক উপাচার্যের পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগ কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এ অবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম কবে শুরু হবে, প্রশাসনিক কাজ কীভাবে স্বাভাবিক হবে এবং উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নতুন সিদ্ধান্ত আসবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা।