আসামের ডিব্রুগড় থেকে ব্রহ্মপুত্র হয়ে বাংলাদেশের ঢাকার পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে আন্তর্জাতিক কার্গো যাত্রা শুরু হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) বোগিবিল টার্মিনাল থেকে মেথানলবাহী কার্গো জাহাজটি বাংলাদেশের পথে রওনা দেয়। ভারতের বন্দর, জাহাজ চলাচল ও নৌপথ মন্ত্রণালয় বলছে, দেশটির স্বাধীনতার পর ডিব্রুগড় থেকে কোনো বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে এটাই প্রথম কার্গো চালান।

আসামের ডিব্রুগড়ের বোগিবিল টার্মিনাল থেকে চালানটি প্রথমে ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ বা ব্রহ্মপুত্র নদপথ ব্যবহার করবে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ নৌপথে পণ্য পরিবহনের জন্য নির্ধারিত Indo-Bangladesh Protocol Route বা ভারত-বাংলাদেশ নৌপ্রটোকল রুট ধরে পানগাঁও বন্দরে পৌঁছাবে।

চালানে রয়েছে Assam Petro-Chemicals Limited (APCL) উৎপাদিত মেথানল। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বন্দর, জাহাজ চলাচল ও নৌপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল সোমবার সকাল ১১টায় বোগিবিল টার্মিনাল থেকে এই যাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।

ভারতের সরকারি ঘোষণায় এই যাত্রাকে ডিব্রুগড় থেকে বিদেশি বন্দরে প্রথম আন্তর্জাতিক কার্গো চলাচল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে স্বাধীনতার পূর্বে ব্রহ্মপুত্র ছিল আপার আসামের সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ, আর ডিব্রুগড় ছিল নদীবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র।

চালানের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দুইটি জাহাজে মোট ১ হাজার ৮০ টন মেথানল পাঠানোর কথা বলা হয়েছে—প্রতিটি জাহাজে ৫৪০ টন করে। অন্যদিকে সোমবার যাত্রা শুরু করা একটি জাহাজের ক্ষেত্রে ৫৪০ টন মেথানল ও ২৭টি কনটেইনারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

পানগাঁও বন্দরে পৌঁছাতে চালানটির প্রায় সাত দিন সময় লাগতে পারে বলে আগে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছিল। বোগিবিল থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত নৌপথের দূরত্ব প্রায় ৭৮৩ কিলোমিটার। এরপর ভারত-বাংলাদেশ নৌপ্রটোকল রুট ধরে চালানটি বাংলাদেশের নদীপথে প্রবেশ করবে।

ভারতের বন্দর ও নৌপথ মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নদীপথে বাণিজ্য যোগাযোগ বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তাদের বক্তব্য, সড়কপথের তুলনায় অভ্যন্তরীণ নৌপথ পণ্য পরিবহনে তুলনামূলক কম ব্যয় ও কম জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্যকে বাংলাদেশের নদীপথ ব্যবহার করে বৃহত্তর বাজারে নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে। পানগাঁও একটি অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল হওয়ায় ঢাকার কাছাকাছি এই বন্দরে উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে সরাসরি নৌপথে পণ্য পৌঁছানোর সুযোগ বাড়লে ভবিষ্যতে আরও পণ্য এই রুটে আসতে পারে। তবে নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে উঠতে পণ্যের পরিমাণ, নৌপথের নাব্যতা, যাত্রার সময়, বন্দরসুবিধা এবং দুই দেশের কাস্টমস ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নৌপথে পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপ্রটোকল ব্যবস্থা নতুন নয়। এর আওতায় দুই দেশের নির্ধারিত নদীপথ ব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। বোগিবিল থেকে পানগাঁওয়ের এই যাত্রা সেই ব্যবস্থাকে উত্তর-পূর্ব ভারতের আরও ভেতরে সম্প্রসারণের একটি নতুন ব্যবহারিক উদাহরণ তৈরি করছে।

এর আগে ২০১৯ সালে ভারতের পূর্বাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করে ব্রহ্মপুত্রের পান্ডু টার্মিনাল পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনের পরীক্ষামূলক চালান পরিচালিত হয়েছিল। ফলে বর্তমান যাত্রাটি একেবারে নতুন নৌপথ তৈরির চেয়ে বিদ্যমান ভারত-বাংলাদেশ নৌসংযোগকে ডিব্রুগড় পর্যন্ত আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এবারের মেথানল চালান সফলভাবে পানগাঁওয়ে পৌঁছানো এবং ভবিষ্যতে একই পথে নিয়মিত পণ্য পরিবহন সম্ভব হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। বিশেষ করে আসামের পণ্য বাংলাদেশের বাজারে আনা এবং বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে ওই অঞ্চলের পণ্যকে অন্য বাজারে নেওয়ার সম্ভাবনা তখন আরও বাস্তব হয়ে উঠবে।