বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালে সই হওয়া চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর তিন মাসেরও কম সময় বাকি। ৩০ বছরের এই চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় গঙ্গার পানির প্রবাহ নির্দিষ্ট সূত্রে দুই দেশের মধ্যে ভাগ হয়। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে ১২ ডিসেম্বর ২০২৬।
নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশ আগের তুলনায় বেশি পানি পাওয়ার দাবি তুলেছে। গত আগস্টে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানান, সরকার ১৯৯৬ সালের চুক্তি নবায়নের সময় বাংলাদেশের জন্য আগের চেয়ে বেশি পানি নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
বর্তমান চুক্তিতে ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহ অনুযায়ী পানি ভাগের একটি নির্দিষ্ট সূত্র রয়েছে। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কায় পানির প্রাপ্যতা ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান ভাগ পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৩৫ হাজার কিউসেক, আর ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ পায়।
তবে নতুন চুক্তির আলোচনা শুধু পানির পরিমাণ নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গঙ্গা অববাহিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা, কৃষি ও শিল্পে বাড়তে থাকা চাহিদা এবং নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য—সবকিছুই এবার আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
আলোচনার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লোকসভায় জানিয়েছিল, ১৯৯৬ সালের চুক্তির নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা তখনও শুরু হয়নি। ভারতের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পানীয় ও শিল্প খাতের পানির চাহিদাসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল।
বাংলাদেশ অবশ্য এরই মধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে। এপ্রিলে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে ১০ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। জুনে ঢাকা আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তাব পাঠানোর পর আগস্ট পর্যন্ত ভারতের জবাফের অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছিলেন কমিটির প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
জুলাইয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছিলেন, চুক্তি নবায়নের বিষয়টি ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে এবং তিনি ভারতের কাছ থেকে সহযোগিতামূলক অবস্থান আশা করছেন। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরবর্তী সময়ে জানিয়েছে, নদী-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দুই দেশের বিদ্যমান যৌথ নদী কমিশন ও কাঠামোবদ্ধ দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমেই আলোচনা করা হবে।
এদিকে ভারতের অভ্যন্তরেও ফারাক্কা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিহারে ফারাক্কা ব্যারাজের পরিবেশগত ও আর্থসামাজিক প্রভাব নিয়ে আপত্তি নতুন করে সামনে এসেছে। ফলে নতুন গঙ্গা চুক্তির আলোচনায় শুধু ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের স্বার্থও প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৯৬ সালের চুক্তি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের গঙ্গার পানি বিরোধে একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। কিন্তু তিন দশক পর নদীর প্রবাহ, জনসংখ্যা, কৃষি, শিল্প এবং জলবায়ুর বাস্তবতা বদলে গেছে। ফলে এবার চুক্তি নবায়নের প্রশ্নটি শুধু পুরোনো শর্ত বহাল রাখার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিই আলোচনার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিসেম্বরের সময়সীমা যত এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশ-ভারত পানি কূটনীতিতে ততই বাড়ছে চাপ। এখন দেখার বিষয়, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দুই দেশ নতুন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না—নাকি গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে নতুন করে দীর্ঘ আলোচনার পথ তৈরি হবে।
