টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভের পর দেশের প্রধান পোশাকশিল্প এলাকাগুলোতে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন। কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার পাশাপাশি সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

গাজীপুরে বৃহস্পতিবার সকালে প্রায় সব পোশাক কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ পোশাক কারখানা চালু ছিল। ভোগড়া, নাওজোর, বোর্ডবাজার ও সাইনবোর্ড এলাকার কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে দেখা গেছে। আগের দিন আকস্মিক ছুটি ঘোষণা করা কয়েকটি কারখানাও বৃহস্পতিবার খুলেছে। তবে জয়দেবপুর-শিববাড়ী সড়কের একটি কারখানার প্রধান ফটক বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। সকাল ৯টা পর্যন্ত নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেও অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ (ডিইপিজেড) বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিতে দেখা গেছে। কেউ কারখানার নিজস্ব পরিবহনে, আবার কেউ হেঁটে কর্মস্থলে পৌঁছেছেন। তবে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে মিছিল করলে সেসব কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেন এবং উৎপাদন কার্যক্রম চলতে থাকে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচলও স্বাভাবিক ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন রাখা হয়েছে।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার পেছনে সরকারের গঠিত মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত ১ নভেম্বর তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম বৈঠকে নতুন মজুরি কাঠামো ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার বিষয়ে সম্মতি হয়। নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রথম বর্ধিত বেতন জানুয়ারি ২০২৭-এ পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে বেতন কত টাকা বাড়বে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানোর দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কিছু কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছিল।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে ১২ প্লাটুন বিজিবি, ৮ প্লাটুন এসআরবি এবং ৫ প্লাটুন আনসার সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কারখানার আশপাশেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার মধ্য দিয়ে আপাতত শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মজুরি বৃদ্ধির দাবির সমাধান এখনো বাকি। নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে আলোচনা কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে শিল্পাঞ্চলে স্থায়ী স্বাভাবিকতা বজায় থাকা। তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় এবং এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন ও কর্মপরিবেশ স্থিতিশীল রাখাও দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।