তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকেরা প্রথম বেতন পাবেন আগামী বছরের জানুয়ারিতে। বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা শেষে বোর্ডের চেয়ারম্যান এ তথ্য জানান। তবে শ্রমিকদের বেতন কত টাকা বাড়বে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে সরকার ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। গত ১ নভেম্বর বোর্ড গঠনের পর বুধবার সকাল ১১টায় এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি নিরপেক্ষ সদস্যও রয়েছেন। সভায় পোশাকশিল্পের মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা এবং নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে তাঁরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। বর্তমান মজুরির তুলনায় তাঁদের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৪০ শতাংশ বেশি।

গত কয়েক বছর ধরে খাদ্য, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। শ্রমিকদের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় কাজ করেও মাস শেষে আয় দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে পোশাক কারখানার মালিকদের পক্ষ থেকে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

মজুরি নিয়ে অসন্তোষের জেরে গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন পোশাকশিল্প এলাকায় বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা, সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ এবং কারখানা বন্ধের খবর পাওয়া গেছে। কয়েক শ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় রপ্তানি কার্যক্রম ও নির্ধারিত চালান পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব অনেক। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কারখানাগুলোর সক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে উচ্চ মজুরি দিয়েও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব। দীর্ঘদিনের শ্রমিক অসন্তোষ শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তাঁরা।

নতুন মজুরি কাঠামো ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার সময়সূচি নির্ধারিত হলেও শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে চূড়ান্ত মজুরির পরিমাণ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মজুরি বোর্ডের পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে পোশাকশ্রমিকদের নতুন বেতনের অঙ্ক। আপাতত জানুয়ারিতে নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রথম বেতন পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন শ্রমিকেরা।