জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, সংশোধনীর কিছু বিধান কার্যকর হলে বিরোধী রাজনৈতিক মত ও গণমাধ্যমের স্বাধীন মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে জামায়াতের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগের আয়োজিত ‘Cyber Security Act 2026: Security, Control or Suppression of Freedom of Expression?’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। পরওয়ারের বক্তব্যের খবর প্রকাশ করেছে ইউএনবি ও ঢাকা ট্রিবিউন।
পরওয়ার বলেন, তাঁর দৃষ্টিতে সরকার যে সংশোধনী আনতে চাইছে, তার মাধ্যমে বিরোধী দল ও গণমাধ্যমের ওপর চাপ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁর অভিযোগ, এতে সরকারের দুর্নীতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন বা বক্তব্য প্রকাশও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তিনি বর্তমান আইন বহাল রেখে প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সাইবার সুরক্ষা আইন কার্যকর হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কেন আবার এতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরওয়ারের ভাষ্য, এত দ্রুত আইন সংশোধনের উদ্যোগ সরকারের নীতিগত অস্থিরতা ও সিদ্ধান্তহীনতার ইঙ্গিত দেয়। এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ হিসেবে এসেছে; এগুলো সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।
সংশোধনী এখনো চূড়ান্ত আইন নয়
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর সংশোধনী প্রস্তাবটি ১৩ সেপ্টেম্বর সর্বসাধারণের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ পরওয়ার যে সংশোধনীর বিরোধিতা করছেন, সেটি এখনো চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি।
এর আগে জুলাইয়ে সংশোধনী খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করার জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। ১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে খসড়ার বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা এবং নাগরিক অধিকার, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সেবার নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশের কথা সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অনলাইনে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, মানহানি, অপমান বা হয়রানিমূলক কনটেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন বা পরিবর্তিত বিধান রাখার কথা এসেছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খসড়ায় মানহানিকে আবারও শাস্তিযোগ্য করার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে ‘গুজব’ বা অসত্য তথ্য ছড়ানোর বিষয়েও নতুন শাস্তির বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এসব বিধান এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন Freedom of Expression Bangladesh-ও জানিয়েছে, ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নথিটি মূল আইনের সংশোধনী প্রস্তাব, চূড়ান্ত আইন নয়।
সরকারের বক্তব্য ভিন্ন
সংশোধনী নিয়ে সমালোচনার মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য সংবাদমাধ্যম বা মুক্তচিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা নয়। ১০ সেপ্টেম্বর তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালীব রহমান সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তচিন্তা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমন করার উদ্দেশ্যে কোনো আইন করা হচ্ছে না। তিনি জানান, খসড়াটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও ১৩ সেপ্টেম্বর বলেন, প্রস্তাবিত আইন সাইবার হয়রানি মোকাবিলা, নারী ও তরুণদের সুরক্ষা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনের অপব্যবহার ঠেকানোর লক্ষ্যেই করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মতপ্রকাশের অধিকার সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত; তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চরিত্রহনন বা আপত্তিকর ভাষা ব্যবহারকে তিনি গঠনমূলক সমালোচনার সঙ্গে এক করে দেখেননি।
অন্যদিকে, সংবাদমাধ্যম ও অধিকারকর্মীদের মধ্যেও খসড়ার কয়েকটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কিছু বিধান অপব্যবহারের আশঙ্কার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে খসড়াটি চূড়ান্ত নয় এবং অংশীজনদের মতামত নিয়ে তা সংশোধনের কথা বলা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও খসড়ার কিছু বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো আলাদা বিষয় একই আইনে সামলাতে গিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হলে তা মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পরবর্তী ধাপ কী
বর্তমানে সংশোধনী প্রস্তাবটি মতামত গ্রহণ ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, খসড়াটি আরও পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিসভা কমিটি কাজ করছে। ফলে মিয়া গোলাম পরওয়ারের আপত্তি এবং অন্যান্য অংশীজনের মতামত চূড়ান্ত আইনে কোন পরিবর্তন আসে কি না, সেটিই এখন মূল বিষয়।
পরওয়ারের বক্তব্যে প্রস্তাবিত আইনের রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যম-সংক্রান্ত সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আপত্তি তুলে ধরা হয়েছে। আর সরকারের অবস্থান হলো, সংশোধনের লক্ষ্য অনলাইন অপব্যবহার ও ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলা করা এবং একই সঙ্গে মতপ্রকাশের অধিকার ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা বজায় রাখা। চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর প্রকৃত আইনি প্রভাব নির্ধারণ করা যাবে না।