নিরাপদ অভিবাসন ও প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রপতির আহ্বান

নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, বিদেশে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিদেশে চাকরি পেতে গিয়ে বাংলাদেশি কর্মীরা যেন প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও অনিশ্চিত কর্মপরিবেশের শিকার না হন, সে জন্য নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রাজধানীতে অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (আরএমএমআরইউ) ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে নিরাপদ অভিবাসন, প্রবাসীদের অবদান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশের অভ্যন্তরে মানুষের স্থানান্তরসহ অভিবাসনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়।

অভিবাসন ব্যয় কমানো ও প্রতারণা বন্ধের তাগিদ

বিদেশে চাকরির আশায় অনেক বাংলাদেশি জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন কিংবা পরিবারের সঞ্চয় ব্যয় করেন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর তাঁদের কেউ কেউ প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না দেওয়া এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের মতো সমস্যার মুখোমুখি হন।

এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে বিদেশে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। প্রতারণা ও অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর পাশাপাশি কর্মীরা যেন বিদেশে যাওয়ার আগেই চাকরির শর্ত, বেতন এবং আইনি অধিকার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রবাসে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলার মিশনগুলোর সেবাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিপদে পড়া কর্মীদের আইনি সহায়তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ানোর পাশাপাশি অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসন ব্যয়ে সহায়তা করে।

তবে প্রবাসীদের অবদানকে শুধু অর্থের হিসাব দিয়ে বিবেচনা করলে তাঁদের শ্রম, ত্যাগ ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের বিষয়টি আড়ালে থেকে যায়। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকে কাজ করা এসব মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ কারণে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার হলে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ কর্মীর চাহিদাও পরিবর্তিত হচ্ছে। শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠানো নয়, তাঁদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মীদের অর্জিত যোগ্যতার স্বীকৃতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ভাষা শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাবিষয়ক জ্ঞান বাড়ানো গেলে বিদেশে কর্মীদের কাজের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে।

নারী অভিবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে যাওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য, বৈধ নিয়োগপত্র এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

দেশে ফেরা কর্মীদের পুনর্বাসন

বিদেশে কাজ শেষে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের জন্যও কার্যকর পুনর্বাসনব্যবস্থা প্রয়োজন। অনেক কর্মী দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করে দেশে ফিরলেও তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর মতো কর্মসংস্থান বা ব্যবসার সুযোগ পান না।

ফিরে আসা কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ অর্থায়ন, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁদের অর্জিত দক্ষতা দেশের অর্থনীতিতে কাজে লাগানো সম্ভব। একই সঙ্গে অভিবাসন থেকে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনযাত্রার আশায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ বড় শহরগুলোতে আসছেন। অন্যদিকে নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও অনেক পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে।

এই অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর শহরের আবাসন, পরিবহন ও নাগরিক সেবার ওপর চাপ তৈরি করে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান বাড়ানো, কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মানুষ যেন বাধ্য হয়ে নয়, বরং নিরাপদ ও পরিকল্পিতভাবে কর্মসংস্থান ও বসবাসের স্থান বেছে নিতে পারে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকার, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, জনশক্তি রপ্তানিকারক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিবাসন নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করলে কর্মীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে।

আরএমএমআরইউর ৩০ বছর পূর্তির আয়োজন অভিবাসন নিয়ে গবেষণা, নীতিনির্ধারণ এবং অধিকারভিত্তিক আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা, দক্ষতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অভিবাসনের সুফল কর্মী, তাঁদের পরিবার এবং জাতীয় অর্থনীতি, সবার জন্য বাড়তে পারে।

বিদেশে কাজের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপদে যাওয়া, মর্যাদার সঙ্গে কাজ করা এবং প্রয়োজন হলে দেশে ফিরে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ নিশ্চিত করাই নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।