বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। চলতি সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৩৫০ জন কর্মী গেছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৬১ জনই গেছেন সৌদি আরবে, অর্থাৎ মোট কর্মীর ৫১ দশমিক ১৬ শতাংশের গন্তব্য ছিল এক দেশ।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত এই হিসাব পাওয়া গেছে। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ১০৪টি দেশে কর্মী গেলেও অর্ধেকের বেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের বাজারে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্য এখনো বাস্তব রূপ পায়নি।
এর পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে বিদেশে কর্মী যাওয়ার প্রবাহও কমেছে। আগের বছরের একই সময়ে ৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেলেও চলতি সময়ে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৩ লাখ ১৮ হাজারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩৯ শতাংশ।
সৌদি আরবের ওপর এই নির্ভরতা অবশ্য নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার বন্ধ বা সীমিত থাকায় সৌদি আরবের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
মালয়েশিয়া ও ওমানের শ্রমবাজার এখনো স্বাভাবিকভাবে চালু হয়নি। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যেও বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে নতুন শ্রমবাজার তৈরি না হওয়ায় হাতেগোনা কয়েকটি দেশের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে অনুসন্ধান করা নতুন গন্তব্যগুলোর কোনোটিই এখনো বড় পরিসরে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কার্যকর বাজারে পরিণত হয়নি।
তবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে নতুন আশার কথাও জানিয়েছে সরকার। জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদি আমিন জানিয়েছিলেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহে নতুন কাঠামোর আওতায় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো পুনরায় শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিএমইএসএলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানানো হয়।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি ও ভাষাজ্ঞানও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতার স্বীকৃতি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সৌদি পক্ষ দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে নিয়োগ ব্যবস্থায় অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সৌদি আরবের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের জন্য সাম্প্রতিক কিছু সুবিধাও এসেছে। গত ৪ আগস্ট সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মূল নিয়োগকর্তা বা স্পনসর ইকামা নবায়ন না করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নতুন নিয়োগকর্তার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের ইকামা নবায়নের সুযোগ থাকবে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাই নতুন বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি দক্ষ কর্মী তৈরি, ভাষা প্রশিক্ষণ, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের বাজার বড় করতে হলে শুধু নতুন দেশের সঙ্গে চুক্তি করাই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে এমন দক্ষতা তৈরি করে সেসব বাজারে নিয়মিত ও নিরাপদভাবে কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তবেই সৌদি আরবনির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে সত্যিকার অর্থে বহুমুখী করা সম্ভব হবে।



