নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নতুন অর্থায়নের আহ্বান জুবাইদা রহমানের
বাংলাদেশের নারীস্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব, উদ্ভাবনী অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান। ১১ অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের একটি উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে তিনি বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে প্রচলিত উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি নতুন অর্থায়ন ও দেশীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জুবাইদা রহমান ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেনস হেলথ বিয়ন্ড এইড’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি নারীস্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসা খাতের ব্যয় হিসেবে না দেখে মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের বদলে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, সহজ শর্তে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপান্তর করা জরুরি। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, দাতব্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদেরও বাংলাদেশের নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
নারীস্বাস্থ্যে ২৫ কোটি ইউরোর উদ্যোগ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনকে ঘিরে বাংলাদেশের নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নে বড় অর্থায়ন উদ্যোগের কথাও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বিদ্যমান একটি সার্বভৌম ঋণের ২৫ কোটি ইউরো নারীস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ব্যবহারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
‘উইমেনস হেলথ ইনিশিয়েটিভ’ নামের এই কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) কর্মসূচিটি প্রণয়নে সহায়তা করেছে এবং বাস্তবায়নের সময় কারিগরি সহযোগিতা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এটি নতুন করে দেওয়া ২৫ কোটি ইউরোর অনুদান নয়। ২০২১ সালে অনুমোদিত ইআইবির একটি বিদ্যমান ঋণের অর্থ নতুন কর্মসূচিতে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে উদ্যোগটির বাস্তবায়ন, অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মাতৃস্বাস্থ্য ও ক্যানসার শনাক্তকরণে গুরুত্ব
নতুন কর্মসূচিতে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি প্রসূতি চিকিৎসা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগীকে উন্নত কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা, জেলা হাসপাতাল এবং নিবিড় পরিচর্যা সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পেতে যেন দূরের বড় শহরে যেতে না হয়, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন জুবাইদা রহমান। তাঁর বক্তব্যে নিরাপদ মাতৃত্ব, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা এবং অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা হস্তক্ষেপ কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি আরও জানান, মাতৃ ও নবজাতকের সেবা সম্প্রসারণে এক লাখ কমিউনিটি ও ওয়েলবিইং কর্মী এবং ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, কমিউনিটি ও ওয়েলবিইং কর্মীদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন।
স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে স্থানীয় পর্যায়ে
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী—এ তথ্য উল্লেখ করে জুবাইদা রহমান নারীস্বাস্থ্যে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে কিশোরীদের রক্তস্বল্পতা, মাতৃ অপুষ্টি, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু এবং নারীদের আক্রান্তকারী প্রাণঘাতী ক্যানসার মোকাবিলার বিষয়ও উঠে আসে।
নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা এবং জটিল রোগীর জন্য দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব সেবা সহজলভ্য করা বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের অধিবেশনে ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিয়েন কেইতা, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিনতাহ আকানদোহ, ইআইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা এবং জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বির্গিট পিকেলসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল টেকসই স্বাস্থ্য অর্থায়ন এবং মিডওয়াইফারি খাতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করে। নারীস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা বাড়াতে বায়ার, রোশে, বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং শারিতে-ইউনিভার্সিটেটসমেডিজিন বার্লিনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক হয়।
বাস্তবায়নেই নির্ভর করবে উদ্যোগের সুফল
নারীস্বাস্থ্য খাতে নতুন অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিকল্পনা সামনে এলেও এর সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসাসেবার মান পর্যবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শহর ও গ্রামের মধ্যে সেবার ব্যবধান কমানোও জরুরি। নারীস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বানের পাশাপাশি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত বাস্তব সেবায় রূপ নেয়।




