তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে দীর্ঘ সময় থাকলে গর্ভবতী নারীদের অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে অকাল জন্মের সম্ভাবনা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও শিশুদের ওপর অতিরিক্ত গরমের স্বাস্থ্যগত প্রভাব মোকাবিলায় ২১ অক্টোবর নতুন বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ কাঠামো প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), ইউনিসেফ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)।

World Health Organization

+2

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

তাপপ্রবাহ ও গর্ভাবস্থার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ১৯৮টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব গবেষণায় ৬৬টি দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে অকাল প্রসবের সম্ভাবনা প্রায় ৪ শতাংশ বাড়ে। অন্যদিকে, তাপপ্রবাহের সময় এই সম্ভাবনা প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।

তবে এই ফলাফলকে সব দেশ বা সব গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। গবেষণাটি তাপমাত্রার সঙ্গে অকাল জন্মের ঝুঁকির সম্পর্ক তুলে ধরেছে, সরাসরি কারণ প্রমাণ করেনি।

নবজাতক ও শিশুদের ওপরও বাড়ছে তাপের প্রভাব

শুধু গর্ভাবস্থায় নয়, জন্মের পরও অতিরিক্ত গরম শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২১ অক্টোবরের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের গড় সময়ের তুলনায় ৩৮৯ শতাংশ বেশি তাপপ্রবাহের দিনের মুখোমুখি হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ১৫০ কোটি শিশু এমন তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে, যা আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন হচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে কিংবা তীব্রতা বাড়ছে।

বিশেষ করে নবজাতক ও ছোট শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় অতিরিক্ত গরমে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।

মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি পর্যবেক্ষণে নতুন উদ্যোগ

তাপপ্রবাহের কারণে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যগত ক্ষতি শনাক্ত করতে নতুন বৈশ্বিক কাঠামোতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক নির্ধারণ করেছে চারটি জাতিসংঘ সংস্থা।

এতে তীব্র গরমের সময় অকাল জন্ম, মৃত সন্তান প্রসব, কম ওজনের নবজাতক, গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ এবং শিশু মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর সংখ্যা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণের প্রবণতাও নজরদারিতে রাখার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবহাওয়ার তাপমাত্রার তথ্যের সঙ্গে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিয়মিত তথ্য মিলিয়ে দেখলে তাপপ্রবাহের সময় স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি নেওয়া এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আগেভাগে সতর্ক করা সহজ হবে।

বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়

বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যগত প্রভাব বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। দেশের প্রেক্ষাপটেও গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত তাপের প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার ৬২৪টি গর্ভাবস্থার ফলাফল বিশ্লেষণ করে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত একটি গবেষণায় তাপমাত্রার সঙ্গে গর্ভপাতের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণায় ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস গড় তাপমাত্রার সময় গর্ভপাতের সমন্বিত সম্ভাবনা ১৬ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এটি তাপমাত্রা ও গর্ভপাতের মধ্যে সম্পর্ক নির্দেশ করে, সরাসরি কারণ প্রমাণ করে না।

এ ছাড়া ইউনিসেফের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বাংলাদেশের গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গরমের দিনে সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের নবজাতকের বিভিন্ন অসুস্থতার আশঙ্কা ১৪ শতাংশ বেশি ছিল।

গর্ভবতী নারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ

স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে তীব্র গরমের সময় গর্ভবতী নারীদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং সম্ভব হলে ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে থাকা জরুরি।

অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে। গর্ভাবস্থায় অস্বাভাবিক শারীরিক সমস্যা, সংকোচন বা শিশুর নড়াচড়ায় পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দেশগুলোকে গরমের জন্য আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও শিশুদের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়তে থাকায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত চিকিৎসাসেবা এবং সচেতনতা বাড়ানো এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।