নারীর স্বাস্থ্যসেবায় ২৫ কোটি ইউরোর পরিকল্পনা, গুরুত্ব পাবে জেলা হাসপাতাল
নারীর স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং দেশের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে ২৫ কোটি ইউরোর একটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ সরকার ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)। ‘উইমেনস হেলথ ইনিশিয়েটিভ’ নামের এ কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীর জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মাতৃ ও নবজাতকের চিকিৎসা, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের সেবা এবং জরুরি প্রসূতিসেবা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
১০ অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত ‘নারী স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক এক বৈঠকে এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য নারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলা।
যেসব সেবায় গুরুত্ব দেওয়া হবে
প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় গর্ভবতী মা ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবা উন্নত করা হবে। পাশাপাশি জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা এবং এসব রোগের সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রসবকালীন জটিলতা এবং নবজাতকের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করাও কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
এ জন্য শুধু বড় হাসপাতাল নয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর, চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে পাঠানো এবং নিবিড় পরিচর্যাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত।
এ উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে মহামারি কিংবা অন্য কোনো বড় স্বাস্থ্যসংকট দেখা দিলে চিকিৎসাব্যবস্থা যেন দ্রুত কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারে, সেই প্রস্তুতি জোরদার করা।
কোথা থেকে আসবে অর্থ
এ কর্মসূচির জন্য প্রস্তাবিত ২৫ কোটি ইউরো নতুন কোনো ঋণচুক্তির মাধ্যমে আসবে—এমন ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং ২০২১ সালে বাংলাদেশের কোভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচি, মহামারির প্রস্তুতি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অনুমোদিত ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের একটি বিদ্যমান ঋণের অর্থ নারীর স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আগে অনুমোদিত অর্থ কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তার একটি নতুন পরিকল্পনা সামনে এসেছে। কর্মসূচিটি ২০২৭ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ঘোষণায় একে পরিকল্পিত উদ্যোগ হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। ফলে অর্থ ব্যবহারের বিস্তারিত কাঠামো ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কারিগরি সহায়তা দেবে ইউএনএফপিএ
কর্মসূচি প্রণয়নে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করেছে ইউএনএফপিএ। বাস্তবায়নের সময় সংস্থাটি কারিগরি সহযোগিতা দেওয়ারও কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট দক্ষতা বাড়াতে অন্তত আড়াই কোটি ইউরো অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এ অর্থ কারিগরি সহায়তায় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক দিনা কিত্তা বলেছেন, নারীর স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ খাতে অর্থায়ন এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাঁর মতে, জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও বিশেষায়িত কারিগরি দক্ষতা যুক্ত হলে বৃহৎ পরিসরে স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি সম্ভব।
ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা বলেন, নারীর স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের সুফল পরিবার, সমাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নেও পড়ে। বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএফপিএর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থায়ন ও কারিগরি দক্ষতাকে একত্র করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য তুলে ধরেন তিনি।
চিকিৎসা থেকে রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্ব
বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, এ বিনিয়োগ চিকিৎসানির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যোন্নয়নকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।
সরকারের ঘোষিত বৃহত্তর স্বাস্থ্য খাত সংস্কার পরিকল্পনায় সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ থেকে পর্যায়ক্রমে ৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি এক লাখ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ২৫ হাজার পেশাদার ধাত্রী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত নারী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে এসব পরিকল্পনার সমন্বয় স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাস্তবায়নই হবে মূল পরীক্ষা
২০২৭–২০৩১ মেয়াদে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ও কিশোরীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও, ঘোষিত পরিকল্পনার সুফল কতটা কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষ করে জেলা হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা, জরুরি প্রসূতিসেবা, ক্যানসার চিকিৎসা এবং রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থায় কতটা উন্নতি হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ সরকার, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ও ইউএনএফপিএর এই উদ্যোগের ঘোষিত লক্ষ্য হলো নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলা। এখন কর্মসূচিটির বাস্তবায়ন কাঠামো, অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতির দিকে নজর থাকবে।

