বাংলা ভাষাকে তথ্যপ্রযুক্তিতে আরও ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরি করেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। অডিও থেকে লেখা তৈরি, বাংলা বানান ও ব্যাকরণ সংশোধন, অনুবাদ, ছবি বা নথি থেকে লেখা শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে এসব প্রযুক্তিতে। তবে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও এসব সফটওয়্যার সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছেছে এবং বাস্তবে কতটা কাজে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৬ সালে হাতে নেওয়া হয়। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। বাংলা ভাষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি করাই ছিল এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
প্রকল্পটির প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ১৬টি সফটওয়্যার, টুল ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও ১০ বছরে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের আগস্টে এর মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রকল্পের আওতায় তৈরি প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষার বানান ও ব্যাকরণ যাচাই, অডিও থেকে লেখা তৈরি, লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরি, ছবি ও নথি থেকে লেখা শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের সুবিধা। পাশাপাশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল কনভার্টার, ইশারাভাষা শনাক্তকরণ এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগও রয়েছে।
প্রকল্পটির সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বাংলা ভাষাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য কাগজ এআই এবং ‘সঠিক’ নামের বানান ও ব্যাকরণ পরীক্ষকসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে।
তবে এসব প্রযুক্তির ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। প্রকল্পের বিভিন্ন সেবার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার ‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবটে প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অনুরোধ আসে। ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে ২৭৫টি। অন্যদিকে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসে। কাগজডটএআইয়ের ওসিআর সেবায় প্রতিদিন অনুরোধের সংখ্যা প্রায় ৫০টি।
প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করে দেখা গেছে, বাংলা বানান সংশোধনের টুলটি তুলনামূলক ভালো ফল দিচ্ছে। তবে অডিও থেকে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে বড় ফাইল ব্যবহারে সমস্যা দেখা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবট সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নের ক্ষেত্রে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারি ওসিআর সেবার সঙ্গে গুগল লেন্সের মতো আগে থেকেই প্রচলিত বিনা মূল্যের প্রযুক্তির তুলনাও সামনে এসেছে। ফলে নতুন করে তৈরি সরকারি প্রযুক্তিগুলো সাধারণ মানুষের কাছে কতটা প্রয়োজনীয় ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারছে, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ব্যয় হওয়া প্রায় ৮০ কোটি টাকার মধ্যে ৬০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও সংরক্ষণে। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অফিস সাজসজ্জা, সভা-সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা ও পরিচালনসংক্রান্ত কাজে।
তবে প্রকল্পের আওতায় তৈরি প্রতিটি প্রযুক্তির পেছনে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং সেই ব্যয়ের বিপরীতে কী ধরনের ফল পাওয়া গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ। তাঁদের মতে, শুধু সফটওয়্যার তৈরি করলেই প্রকল্পের সফলতা নিশ্চিত হয় না। প্রযুক্তিগুলো মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন কতটা পূরণ করছে এবং ব্যবহারকারীরা সহজে সেগুলো ব্যবহার করতে পারছেন কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
প্রযুক্তিগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হিসেবে উঠে এসেছে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। প্রকল্প কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহৃত জিপিইউ সক্ষমতা দিয়ে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান সক্ষমতায় একসঙ্গে প্রায় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারী বিভিন্ন সেবা নিতে পারবেন। তবে চাহিদা বেড়ে গেলে ব্যবহারকারীদের অপেক্ষা করতে হতে পারে। এ কারণে সেবাগুলো আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অতিরিক্ত জিপিইউ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন।
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর এসব সফটওয়্যার ও তথ্যভান্ডার কীভাবে সচল রাখা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে জিপিইউ কেনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও থাকবে।
তবে শুধু অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তির হালনাগাদ এবং ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবার মান উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর প্রযুক্তিগুলো সচল রাখা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলোর ব্যবহার বাড়ানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
আইসিটি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ও কার্যকারিতা নিয়েও এর আগে প্রশ্ন উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে নেওয়া ২১টি প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। এসব প্রকল্প পর্যালোচনার জন্য ২০২৪ সালের আগস্টে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির মূল্যায়নে কয়েকটি প্রকল্পের কার্যক্রমে উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসংগতি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিষয় উঠে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন মনে করেন, আইসিটি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অতীতের কার্যক্রম ও প্রকল্পের ফলাফল যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
অন্যদিকে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলা ভাষার প্রযুক্তি উন্নয়নে এ উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু সফটওয়্যার তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮ হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টা এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও এবং ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত উন্নয়নে প্রকল্পটির সম্ভাবনা থাকলেও বড় প্রশ্ন এখন এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে। প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি প্রযুক্তিগুলো কতটা কার্যকরভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে, অবশিষ্ট কাজ কতটা সফল হবে এবং সরকারি অর্থে তৈরি এসব সেবা ভবিষ্যতেও সচল থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের পরবর্তী বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার ওপর।
