রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান কার্যালয়ের সামনে রোববার সকালে মুখোমুখি অবস্থান নেয় দুই পক্ষ। একদিকে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা কর্মচারীরা চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে অবস্থান নেন। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা পাল্টা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
১৩ সেপ্টেম্বর সকালে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে দুই পক্ষের লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে এলাকায় উত্তেজনা বাড়ে। উভয় পক্ষ নিজ নিজ দাবিতে স্লোগান দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাংকপাড়ায় সতর্ক অবস্থান নেয়।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা কর্মচারীদের মূল দাবি, কোনো শর্ত ছাড়াই তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে এবং বকেয়া বেতন ভাতার বিষয়ও নিষ্পত্তি করতে হবে। আন্দোলনকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাদের চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এতে হাজারো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের দেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীর সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
চাকরিচ্যুতদের একজন আনোয়ার অভিযোগ করেন, সবাইকে একইভাবে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত করে চাকরিচ্যুত করা ন্যায়সংগত হয়নি। নিয়োগে অনিয়ম বা জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে সচেতন গ্রাহক ফোরামের সদস্যরা চাকরিচ্যুতদের ঢালাও পুনর্বহালের বিরোধিতা করছেন। তাদের দাবি, ইসলামী ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে, ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত না করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
ফোরামের সহসভাপতি শামিম হাসনাইনের অভিযোগ, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের সময় অনেক নিয়োগে নিয়ম মানা হয়নি এবং কিছু ক্ষেত্রে জাল শিক্ষাসনদের অভিযোগ ছিল। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সনদ যাচাই ও যোগ্যতা মূল্যায়নের উদ্যোগ নিলেও সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা পরীক্ষায় অংশ নেননি। এসব অভিযোগ অবশ্য সব চাকরিচ্যুত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের সময়ে ব্যাংকটিতে ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছিলেন। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, এর বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা বা প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
এই বিতর্কের মধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসলামী ব্যাংক একটি বিশেষ দক্ষতা মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ৩৮৫ জনকে পরীক্ষায় অংশ নিতে বলা হলেও ৪১৪ জন অংশ নেন। পরীক্ষা বর্জনকারীদের মধ্যে ৪ হাজার ৯৭১ জনকে প্রথমে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে রাখা হয় এবং পরে ২০০ জনকে চাকরিচ্যুত করার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে চাকরিচ্যুতির সংখ্যা ও প্রক্রিয়া নিয়েও বিরোধ আরও বাড়ে। চাকরিচ্যুত কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেন, যথাযথ নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আবার বলেছে, সনদ যাচাই, মূল্যায়ন পরীক্ষা এবং চাকরিবিধি অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানই চলমান আন্দোলনের অন্যতম মূল কারণ।
বিষয়টি শুধু ইসলামী ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা একাধিক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে নিয়োগ ও পরবর্তী চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ ব্যাংক সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিকে ছয়টি ইসলামী ব্যাংকের বিতর্কিত নিয়োগের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে নেওয়া চাকরিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোও পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
রোববারের কর্মসূচির সময় পুলিশ দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংঘাত এড়াতে সতর্ক অবস্থান নেয়। পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, যেকোনো আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে এবং জনদুর্ভোগ কম হয় এমন স্থানে আয়োজন করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বড় জমায়েত জোর করে সরাতে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলেও তিনি জানান।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা কর্মচারীদের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইসলামী ব্যাংকের ভেতরে গিয়ে স্মারকলিপিও দেয়। পুলিশ জানিয়েছে, কর্মসূচির সঙ্গে সাম্প্রতিক কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সরাসরি সংযোগের তথ্য তাদের কাছে তখন পর্যন্ত ছিল না।
সকাল থেকে চলা পাল্টাপাল্টি অবস্থান দুপুরের দিকে শেষ হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হিসাবে দুই পক্ষ প্রায় ১২টা ৫০ মিনিটে এলাকা ছাড়ে, আর ইত্তেফাক জানিয়েছে দুপুর ১টার দিকে কর্মসূচি শেষ হয়। অর্থাৎ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুপুরের মধ্যেই উভয় পক্ষ ইসলামী ব্যাংকের সামনে থেকে সরে যায়।
তবে বিরোধ এখানেই শেষ হচ্ছে না। সচেতন গ্রাহক ফোরাম এবং চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা কর্মচারী উভয় পক্ষই সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, আবার অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও আশপাশের মতিঝিল ব্যাংকপাড়ায় সোমবারও বাড়তি নিরাপত্তা ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।


