সরকারি বাসার সাবলেট বন্ধের নির্দেশ, আবাসনসংকটে আজিমপুরের ছাত্রীরা

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনিতে সাবলেটে থাকা ছাত্রীদের অনেকেই হঠাৎ বাসা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সরকারি আবাসনে অননুমোদিতভাবে ভাড়া ও সাবলেট বন্ধের নির্দেশনার পর নতুন থাকার জায়গা খুঁজতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। সামনে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় আবাসনসংকটের পাশাপাশি পড়াশোনা নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।

গত ৩১ অক্টোবর ছিল সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার শেষ দিন। এর মধ্যে সরকারি বাসায় থাকা সাবলেট ও ভাড়াটেদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের পরও কোনো সরকারি ফ্ল্যাটে ভাড়াটে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বাসার বরাদ্দ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মাত্র কয়েক দিনের নোটিশে বাসা ছাড়ার চাপ

আজিমপুর সরকারি কলোনির একটি ভবনে সাবলেটে থাকা ইডেন মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে জানান, গত ২২ অক্টোবর তাঁকে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়। তখন তিনি দুর্গাপূজার ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। ২৬ অক্টোবর ঢাকায় ফিরে আর আগের বাসায় থাকতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে বাড়িওয়ালার মৌখিক চুক্তি ছিল, বাসা ছাড়তে হলে অন্তত দুই মাস আগে জানাতে হবে। কিন্তু সেই শর্ত মানা হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ। ডিসেম্বর মাসে চূড়ান্ত পরীক্ষা থাকায় নতুন বাসা খোঁজা ও মালপত্র সরানোর চাপে পড়াশোনার প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তিনি।

একই কলোনিতে থাকা বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের আরেক শিক্ষার্থীও নতুন বাসা খুঁজতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় রাত ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত খোঁজ করেও থাকার জায়গা পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি।

হলের আসন না পেয়ে ভাড়া বাসায় শিক্ষার্থীরা

আজিমপুর সরকারি কলোনিতে শুধু ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজের শিক্ষার্থীরাই নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ এবং কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সের শিক্ষার্থীরাও সাবলেটে থাকেন। তাঁদের বড় একটি অংশ নারী শিক্ষার্থী।

বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় পড়তে আসা এসব শিক্ষার্থীর অনেকেই আবাসিক হলে আসন না পেয়ে সরকারি কলোনির বাসায় কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে আজিমপুর তাঁদের কাছে আবাসনের পছন্দের জায়গা হয়ে উঠেছিল।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আজিমপুর ও পলাশীর সরকারি কলোনি থেকে কয়েক দিনের মধ্যে শত শত শিক্ষার্থী ও অন্যান্য পেশার ভাড়াটে বাসা ছেড়েছেন। তাঁদের অনেকেই নতুন আবাসন নিশ্চিত করতে পারেননি।

সেমিস্টার পরীক্ষার আগেই নতুন আবাসনসংকট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন ছাত্রীও এই পরিস্থিতিতে পড়েছেন। তাঁদের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ১ নভেম্বর থেকে।

জাগোনিউজ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বিভাগের এক শিক্ষার্থী হাফসা খানম (ছদ্মনাম) ২৪ অক্টোবর বাড়িওয়ালার কাছ থেকে সাবলেট বন্ধের নির্দেশের কথা জানতে পারেন। পরীক্ষার কথা বিবেচনা করে ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকার সুযোগ চাইলেও পরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

একই বিভাগের আরও দুই ছাত্রী আজিমপুর সরকারি কলোনির ৩ নম্বর ভবনে থাকেন। তাঁদের ২৭ অক্টোবর দ্রুত বাসা ছাড়তে বলা হয়। তাঁদের পরীক্ষা ১৪ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। নতুন বাসা না পাওয়ায় আপাতত পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

একই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তদন্তের ভয়ে তাঁকে দিনের বেলায় বাসার বাইরে থাকতে হয়েছে। ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরে নিজের বই-খাতাসহ জিনিসপত্র সরিয়ে রাখা অবস্থায় দেখতে পান বলেও জানান তিনি।

কী বলছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর?

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি আবাসন পরিদপ্তর গত ২৯ অক্টোবর একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে বরাদ্দ করা বাসা তাঁদের নিজের বসবাসের জন্য। অন্যের কাছে পুরো বাসা কিংবা এর কোনো অংশ ভাড়া বা সাবলেট দেওয়া বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধিমালা, ১৯৮২-এর পরিপন্থী।

বিজ্ঞপ্তিতে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ভাড়াটে ও সাবলেট গ্রহীতাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরও সরকারি বাসায় অননুমোদিতভাবে ভাড়াটে পাওয়া গেলে বরাদ্দ বাতিলসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, ভাড়াটেদের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বাসা ছাড়ার সময় দেওয়া হয়েছিল। এখন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সরকারি আবাসনে পরিদর্শনে যাবেন। কোনো বাসায় সাবলেট বা ভাড়াটে পাওয়া গেলে বরাদ্দপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, এক দিনের নোটিশে বাসা ছাড়তে বলা হয়নি, এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এরই মধ্যে অধিকাংশ ভাড়াটে বাসা ছেড়ে দিয়েছেন।

আজিমপুরে রয়েছে ৩ হাজারের বেশি সরকারি ফ্ল্যাট

সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে বিভিন্ন শ্রেণির মোট ১৯ হাজার ৯১টি সরকারি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে আজিমপুর এলাকায় রয়েছে ৩ হাজার ২৫২টি ফ্ল্যাট।

দীর্ঘদিন ধরে এসব সরকারি বাসার কিছু অংশে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজেরা না থেকে অন্যদের কাছে ভাড়া দিতেন। কেউ পুরো ফ্ল্যাট, আবার কেউ এক বা একাধিক কক্ষ সাবলেট দিতেন। এবার সেই অনিয়ম বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষার্থীদের দাবি বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা

সরকারি বাসায় নিয়মবহির্ভূতভাবে ভাড়া দেওয়া বন্ধের উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন না শিক্ষার্থীরা। তবে তাঁদের অভিযোগ, অল্প সময়ে বাসা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ায় নতুন আবাসন খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, বাড়তি ভাড়া, অগ্রিম টাকা এবং মালপত্র স্থানান্তরের বিষয়গুলো একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।

তাঁদের দাবি, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে জরুরি ভিত্তিতে আসন বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি নতুন বাসা খুঁজে নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের আরও সময় দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকারি আবাসনে অনিয়ম বন্ধের উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে সামনে পরীক্ষা থাকায় দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা না হলে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও নিরাপত্তা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।