সন্ধ্যার ব্যস্ততাতেও বদলে গেছে মিরপুর-১০
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় হকার উচ্ছেদের পর সড়ক ও ফুটপাতের চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে ফুটপাতজুড়ে অস্থায়ী দোকান, পণ্যসামগ্রী ও ক্রেতাদের ভিড়ে হাঁটার জায়গা পাওয়া কঠিন ছিল, সেখানে এখন অনেকটাই স্বচ্ছন্দে চলাচল করছেন পথচারীরা। সড়কের পাশের দোকান সরিয়ে দেওয়ায় যানবাহন চলাচলেও আগের তুলনায় স্বস্তি ফিরেছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উচ্ছেদ অভিযানের পর মিরপুর-১০, হোপ মার্কেট, হোপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনের সড়ক এবং মিরপুর-১ ও কচুক্ষেতমুখী সড়কের বিভিন্ন অংশে এই পরিবর্তন দেখা যায়। ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, এসব এলাকায় সড়কের পাশের দোকান ও হকারদের উপস্থিতি না থাকায় যানজটের চেনা চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
ঢাকা ট্রিবিউন
ফুটপাত ফিরে পেয়েছেন পথচারীরা
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে বসত অস্থায়ী দোকান। বিশেষ করে হোপ স্কুলের সামনের সড়কে দোকানপাট ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার কারণে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। পথচারীদের অনেকে বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতেন। এতে যানবাহন ও মানুষের চলাচল একই জায়গায় এসে মিশে যেত, বাড়ত ভোগান্তি।
৭ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হোপ স্কুল রোডের সড়কের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত দোকানপাট বিস্তৃত ছিল। উচ্ছেদের পর ওই এলাকার ফুটপাত ও সড়কের দখলমুক্ত অংশে এখন মানুষ স্বচ্ছন্দে চলাচল করতে পারছেন।
বাসস
প্রায় ২০ বছর ধরে মিরপুরে বসবাস করা শরীফুল ইসলাম বাসসকে জানান, আগে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটার সুযোগ পেতেন না। উচ্ছেদের পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারছেন বলে স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি।
শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরাও উপকৃত হচ্ছেন। মিরপুর থেকে মেট্রোরেলে নিয়মিত যাতায়াত করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ অহোনা বাসসকে বলেন, আগে দোকান ও মানুষের ভিড় ঠেলে স্টেশনে পৌঁছাতে সময় লাগত। এখন খোলা ফুটপাত ধরে দ্রুত স্টেশনে যাওয়া যাচ্ছে।
যানজট কমায় স্বস্তিতে ট্রাফিক পুলিশ
মিরপুর-১০ এলাকায় যানজটের অন্যতম কারণ ছিল ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো এবং সড়কের ব্যবহারযোগ্য জায়গা কমে যাওয়া। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে না পেরে মানুষ মূল সড়কে নেমে আসতেন। অন্যদিকে, রাস্তার পাশের দোকান ও যানবাহনের জটলায় চলাচলের পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ত।
বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে মিরপুর-১০ এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সার্জেন্ট আব্দুল আজিজ জানান, আগে সড়কের পরিস্থিতি এমন ছিল যে মনে হতো বাজারের মধ্য দিয়ে গাড়ি চলছে। এখন যানবাহন চলাচলের জায়গা বেড়েছে, ফুটপাত দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারছেন এবং ট্রাফিক পুলিশের কাজের চাপও কমেছে।
৯ অক্টোবর ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনেও মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে কচুক্ষেত ও মিরপুর-১ অভিমুখী সড়কের বিভিন্ন অংশে যানজট কমে আসার কথা উঠে আসে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে দিনের দীর্ঘ সময় ধরে চলাচলে ভোগান্তি থাকলেও উচ্ছেদের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মিরপুর-১০ এলাকার যানজটের সব কারণ দূর হয়ে গেছে। সড়কের অন্য অংশে যানবাহনের চাপ, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং কিংবা অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা থাকলে সেগুলোরও সমাধান প্রয়োজন। বর্তমান পরিবর্তন ধরে রাখতে নিয়মিত নজরদারি জরুরি।
উচ্ছেদ অভিযানে সংঘর্ষ, পুড়েছিল সিটি করপোরেশনের গাড়ি
হকার উচ্ছেদকে ঘিরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ এলাকায় উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ডিএনসিসির কর্মীরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ফুটপাতের অবৈধ স্থাপনা সরানোর অভিযান চালালে হকারদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় সিটি করপোরেশনের কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, ভাঙচুর করা হয় বিভিন্ন যানবাহন এবং পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন আহত হন।
ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন সকাল ১০টার দিকে হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাত থেকে অভিযান শুরু হয়েছিল। সংঘর্ষের সময় সিটি করপোরেশনের দুটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং তিনটি বুলডোজার ভাঙচুর করা হয় বলে এক কর্মকর্তা জানান। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এরপরও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ অব্যাহত রাখে সিটি করপোরেশন। উচ্ছেদের পরদিন থেকে মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকায় হকারদের উপস্থিতি অনেক কমে যায়। পরবর্তী কয়েক দিনেও ফুটপাতের বড় অংশ ফাঁকা ছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে।
খালি জায়গায় গাছ লাগানো ও পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ
উচ্ছেদের পর খালি হয়ে যাওয়া জায়গাগুলো শুধু ফাঁকা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না ডিএনসিসি। সংস্থাটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ৫ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। পরদিন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, তিনি উচ্ছেদ হওয়া স্থাপনার জায়গায় গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, নালা-নর্দমার সংস্কার এবং ডাস্টবিন স্থাপনের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশও দেন তিনি। মিরপুর-১০ থেকে শেওড়াপাড়া পর্যন্ত মেট্রোরেলের পিলার ও আশপাশের দেয়াল থেকে অবৈধ পোস্টার-লিফলেট সরানো এবং এলাকাটিকে পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল করে তোলার পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করেন ডিএনসিসি প্রশাসক।
৭ অক্টোবর বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, হকারদের জীবিকার জন্য ব্যবসার সুযোগ থাকতে হবে, তবে তা মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে নয়। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত জায়গায় ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ফুটপাত দখল করে আবার দোকান বসানো হলে জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হকারদের জীবিকার প্রশ্নও থাকছে
ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় পথচারীদের স্বস্তি ফিরলেও হকারদের জীবিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। উচ্ছেদের ফলে অস্থায়ী দোকান সরেছে, কিন্তু যাঁরা এসব দোকানের ওপর নির্ভর করে সংসার চালাতেন, তাঁদের আয়ের পথও সংকুচিত হয়েছে।
৯ অক্টোবর প্রকাশিত ঢাকা কুরিয়ারের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, হকারদের উপস্থিতি না থাকায় কিছু স্থায়ী দোকানদারও আগের মতো ক্রেতা পাচ্ছেন না। প্রতিবেদনে এক ব্যবসায়ী জানান, উচ্ছেদের পর তাঁর দোকানের বিক্রি আগের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, কিছু স্থায়ী ব্যবসায়ী ফুটপাত পরিষ্কার হওয়ায় তাঁদের দোকানে ক্রেতা বাড়ার কথাও জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি হকারদের জন্য নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা গেলে দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব হতে পারে। তবে সে জন্য কার্যকর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
পরিবর্তন ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানের পর যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তার সুফল নির্ভর করছে ফুটপাত ও সড়কগুলো কতটা নিয়মিত দখলমুক্ত রাখা যায় তার ওপর। অভিযান শেষ হওয়ার পর আবার দোকান বসতে শুরু করলে পুরোনো পরিস্থিতি ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, শুধু মিরপুর-১০ নয়, রাজধানীর অন্যান্য এলাকার ফুটপাতও পথচারীদের ব্যবহারের উপযোগী করা হবে। একই সঙ্গে হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে জনদুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি তাঁদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা সম্ভব হবে।
মিরপুর-১০-এর সাম্প্রতিক চিত্র দেখিয়েছে, ফুটপাতের দখল সরানো হলে পথচারীদের চলাচলের জায়গা বাড়ে এবং সড়কের ওপর চাপ কমতে পারে। এখন এই পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে পারে কি না, সেটিই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জন্য বড় পরীক্ষা।








