এআইয়ের বিনিয়োগে বিশ্ব অর্থনীতিতে গতি, বাড়ছে ঋণ ও জ্বালানির ঝুঁকি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি ৩.১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৩ শতাংশ।
তবে প্রবৃদ্ধির এই সম্ভাবনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। আইএমএফের মূল্যায়নে, বিশ্ব অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে টিকে থাকলেও বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রবৃদ্ধির ব্যবধান বাড়ছে।
প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে এআই
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান প্রবৃদ্ধিতে এআই প্রযুক্তির বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণ, উন্নত কম্পিউটার চিপ, তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো এবং এআই-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ বাড়ায় কয়েকটি দেশের উৎপাদন ও বাণিজ্য উপকৃত হচ্ছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত এবং এআই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো এই বিনিয়োগের সুফল পাচ্ছে। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতি সব অর্থনীতিতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে না। এআই উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার বাইরে থাকা অনেক দেশ তুলনামূলক কম সুবিধা পাচ্ছে।
আইএমএফের আশঙ্কা, এআই খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মূল্যায়ন কমে যেতে পারে। এতে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ এআই এখন প্রবৃদ্ধির একটি বড় চালিকা শক্তি হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল কতটা বাস্তব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের আরেকটি কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। এই সংঘাতের কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। রয়টার্সের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে।
আইএমএফ সতর্ক করেছে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হবে এবং ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোতে বেশি পড়তে পারে। এসব দেশের জ্বালানি আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারি ঋণ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় ঝুঁকি সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ। ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে সরকারগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় করার সক্ষমতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে উন্নত অর্থনীতিগুলোর নিট ঋণগ্রহণ তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫.২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উচ্চ সুদের হার ও ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
সরকারি ঋণের চাপ বাড়লে নতুন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য সরকারের হাতে থাকা আর্থিক সুযোগও কমে যায়। জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষকে সহায়তা দিতে বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সংকট থেকে রক্ষা করতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সব দেশ সমানভাবে সুফল পাচ্ছে না
এআই খাতের বিনিয়োগ এবং জ্বালানির বাজারে অস্থিরতার প্রভাব বিভিন্ন দেশের ওপর ভিন্নভাবে পড়ছে। প্রযুক্তি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলো বিনিয়োগের সুফল পেলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং তুলনামূলক কম আয়ের দেশগুলো বেশি চাপে পড়ছে।
এ ধরনের অর্থনীতিতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ পরিশোধের চাপ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। ফলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গড় হার বাড়লেও প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে একইভাবে উন্নত হচ্ছে, তা বলা যায় না।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম, আমদানির পরিমাণ, বিনিময় হার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি বাড়ার পূর্বাভাস
আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাসে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। তবে এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হওয়া নির্ভর করবে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানির বাজার এবং বিনিয়োগের ধারাবাহিকতার ওপর।
সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, সরকারগুলোকে সরকারি অর্থব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকা এবং নতুন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তির সুফল আরও বেশি দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, এআই বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিকে গতি দিলেও সেই প্রবৃদ্ধি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। জ্বালানির দাম, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সরকারি ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে বর্তমান প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।




