বাবার কারাবাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নর: ইতিহাস গড়া কেইশা ল্যান্স বটমসের জীবনকাহিনি

পারিবারিক সংকট, বাবার কারাবাস এবং মায়ের আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এক নারী এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের নাম। তিনি কেইশা ল্যান্স বটমস। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রিক জ্যাকসনকে পরাজিত করে দেশটির ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জর্জিয়ার প্রথম নারী গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন এই ডেমোক্র্যাট নেতা।

গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এ বিজয় অর্জন করেন বটমস। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান দলের ব্যবসায়ী রিক জ্যাকসন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর তাঁর বিজয় নিশ্চিত হয়। এর মধ্য দিয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা জর্জিয়ার গভর্নর পদ আবার ডেমোক্র্যাটদের হাতে ফিরল। তিনি বিদায়ী গভর্নর ব্রায়ান কেম্পের স্থলাভিষিক্ত হবেন।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

জর্জিয়ার আটলান্টায় জন্ম নেওয়া কেইশা ল্যান্স বটমসের শৈশব খুব একটা সহজ ছিল না। তাঁর বাবা ছিলেন প্রয়াত আরঅ্যান্ডবি সংগীতশিল্পী মেজর ল্যান্স এবং মা সিলভিয়া রবিনসন। বাবার কারাবাস ও মায়ের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি।

বিভিন্ন সময়ে বটমস জানিয়েছেন, শৈশবের এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে আইন পেশা ও জনসেবার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। আটলান্টার ফ্রেডরিক ডগলাস হাইস্কুলে পড়াশোনা শেষে তিনি ফ্লোরিডা এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনীতিতে প্রবেশের আগে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।


সিটি কাউন্সিল থেকে আটলান্টার মেয়র

২০০৯ সালে আটলান্টা সিটি কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ২০১৩ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৭ সালে আটলান্টার মেয়র নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী মেরি নরউডকে পরাজিত করে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শহরটির ৬০তম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁকে একাধিক বড় সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন এবং জর্জ ফ্লয়েডের মৃ/ত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রতিবাদ কর্মসূচি ছিল তাঁর মেয়রজীবনের উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ।

তাঁর প্রশাসন সাশ্রয়ী আবাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে শহরে সহিংস অপরাধ বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন তিনি।

২০২১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন বটমস। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মেয়রের দায়িত্ব ছাড়েন।


হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

আটলান্টার মেয়রের দায়িত্ব ছাড়ার পর ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে যোগ দেন বটমস। তাঁকে প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং হোয়াইট হাউস অফিস অব পাবলিক এনগেজমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এই পদে তিনি ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন, নাগরিক অধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজ পরিচালনা করেন।

২০২৩ সালে হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব ছাড়ার পর আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। পরবর্তী সময়ে জর্জিয়ার গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান।


নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা

গভর্নর নির্বাচনের প্রচারে বটমসের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইড সম্প্রসারণ, জর্জিয়ার ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৫ ডলারে উন্নীত করা, সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।

এ ছাড়া স্থানীয় অবকাঠামো ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক স্থগিতাদেশের পক্ষেও অবস্থান নেন বটমস।

তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিক জ্যাকসন ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা খাতের একজন ধনকুবের ব্যবসায়ী এবং জ্যাকসন হেলথকেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা। নির্বাচনী প্রচারে তিনি কর কমানো, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্যাকসনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বটমস সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও বারাক ওবামাসহ একাধিক প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতার সমর্থন পান।


যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিজয়?

জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে বটমসের বিজয় শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

এর আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী স্ট্যাসি আব্রামস ২০১৮ ও ২০২২ সালে জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়ী হতে পারেননি। এবার বটমসের বিজয়ের মধ্য দিয়ে অঙ্গরাজ্যটির সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে প্রথমবারের মতো একজন নারী এবং কৃষ্ণাঙ্গ নারী দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

এদিকে জর্জিয়ার গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাবর্তন অঙ্গরাজ্যটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণেও পরিবর্তন এনেছে। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে জয়ী হলেন।

তবে তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করা হবে নতুন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

বাবার কারাবাস ও পারিবারিক আর্থিক সংকট থেকে শুরু করে আইন পেশা, আটলান্টার মেয়র এবং হোয়াইট হাউসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন, সবশেষে জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচিত হওয়া; কেইশা ল্যান্স বটমসের এই যাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নারী ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত করেছে।