কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) উন্নয়ন ও ব্যবহারে মানবিক মূল্যবোধ, মানুষের অধিকার এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা ব্যাপক হলেও এর অগ্রগতি কোনোভাবেই মানবিক মূল্যবোধের ক্ষতির বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি নিরাপদ, স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাভিত্তিক একটি সমন্বিত জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা সীমাহীন। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি মানুষের মৌলিক মূল্যবোধ ও অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে। এআই ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান লক্ষ্য।
জাতীয় এআই নীতিতে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব
রাষ্ট্রপতি তাঁর বার্তায় এআই প্রযুক্তির নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য একটি সমন্বিত নীতিকাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তির স্বচ্ছ ব্যবহার, বৈষম্যহীনতা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর মতে, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ এর সুফল পেতে পারেন। প্রযুক্তির কারণে কোনো জনগোষ্ঠী যেন বৈষম্যের শিকার না হয়, সে বিষয়টিও জাতীয় নীতি প্রণয়নে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
এ ছাড়া এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রয়োগে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সম্প্রদায় এবং প্রবাসী পেশাজীবীদের বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। মানবকল্যাণে ব্যবহারযোগ্য এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এআইয়ের সম্ভাবনা
রাষ্ট্রপতি বলেন, দায়িত্বশীলভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং সরকারি সেবার মান উন্নত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের তরুণ ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী জনগোষ্ঠীকে এ ক্ষেত্রে বড় সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এআইয়ের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও উৎপাদনশিল্পে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও জানান রাষ্ট্রপতি।
বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পসহ দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা উন্নত করার সুযোগ রয়েছে।
এআই শিক্ষা ও গবেষণায় সরকারের উদ্যোগ
দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, এআইভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া গভীর প্রযুক্তি বা ডিপ-টেক খাতের কাঁচামাল আমদানিতে করছাড় এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের জন্য উদ্ভাবনী অনুদানের মতো সহায়তামূলক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির মতে, এসব উদ্যোগ দেশের তরুণ প্রতিভাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক রূপান্তরেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় এআই বিজনেস সামিট
আগামী বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) যৌথভাবে দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করছে।
সম্মেলনে সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রযুক্তি উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তারা অংশ নেবেন। এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা, ব্যবসায়িক প্রয়োগ, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হবে।
এ উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় রাষ্ট্রপতি আয়োজকদের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী অতিথি, বক্তা, গবেষক, উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তাদের শুভেচ্ছা জানান।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই সম্মেলনের মাধ্যমে দেশের এআই প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়বে। পাশাপাশি প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ ও নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।