ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার মধ্যে উত্তপ্ত কথোপকথনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সরাইল থানায় ওসির কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। পরে তাঁদের কথোপকথনের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা নিয়ে অসন্তোষ এবং ওসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।

রুমিন ফারহানার কর্মী-সমর্থকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরেই সংসদ সদস্য ও সরাইল থানার ওসির মধ্যে যোগাযোগ নিয়ে সমস্যা চলছিল। সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী জাকির হোসেন একাধিকবার ফোন করেও ওসির সাড়া পাননি বলে তাঁরা দাবি করেন। একই সঙ্গে দুর্গাপূজার সময় সরাইল এলাকায় পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা না পাওয়ার অভিযোগও তোলেন রুমিন ফারহানা।

এসব বিষয়ে কথা বলতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে নেতা-কর্মীদের নিয়ে সরাইল থানায় যান তিনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে ওসির কক্ষে সংসদ সদস্য, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ও উপস্থিত নেতা-কর্মীদের সঙ্গে উত্তপ্ত কথোপকথন দেখা যায়।

রুমিন ফারহানা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দুর্গাপূজার সময় আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে পুলিশ তাঁকে নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে তা দেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, ব্যক্তিগত সহকারী ১২ বার ফোন করেও ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। ওসি তাঁকে নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে বলে জানিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, এখন থেকে তিনি ১০ হাজার লোকজন নিয়েই চলবেন।

রুমিন ফারহানার বক্তব্য, নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে পুলিশ তাঁকে নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলতে থানায় যান বলে জানান সংসদ সদস্য।

থানার ওসির কক্ষে কথোপকথনের একপর্যায়ে রুমিন ফারহানা মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ইটভাটা, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ওসির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের একটি তালিকা নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তালিকায় নির্দিষ্ট তারিখ ও ঘটনার উল্লেখ ছিল। তবে ওসি সেসব বিষয়ে সন্তোষজনক উত্তর দেননি বলে দাবি করেন সংসদ সদস্য।

একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই সময় উপস্থিত স্থানীয় এক ব্যক্তি উন্দা মিয়া ওসির বিরুদ্ধে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, এক আত্মীয়ের মামলার বিষয়ে থানায় গেলে তাঁকে মারধর ও আটক করা হয়েছিল এবং পরে আদালতে পাঠানো হয়। তবে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়াও ওই ব্যক্তির অভিযোগ নাকচ করে বলেন, অভিযোগকারীকে তিনি চেনেন না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো তদন্তের ফলাফল সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ঘটনার সময় ওসির কক্ষে রুমিন ফারহানার সঙ্গে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা-কর্মী ও স্থানীয় লোকজন উপস্থিত ছিলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে ওসি পুলিশ সুপারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে কক্ষে উপস্থিত লোকজনকে দেখান। এ সময় তিনি থানায় অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কার কথা জানান বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সংসদ সদস্য শত শত লোকজন নিয়ে থানায় এসে তাঁর কক্ষে হইচই করেন এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেন। তাঁর দাবি, পূজাকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য আলাদা পুলিশ দল রাখা ভিন্ন বিষয়। সীমিত জনবল দিয়ে থানার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ওই সময় আলাদা দল দেওয়া কঠিন ছিল বলেও জানান তিনি।

ওসির বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান প্রয়োজন হলে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আবেদন করা উচিত। অন্যদিকে, রুমিন ফারহানার বক্তব্য হলো, তাঁর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রাপ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। এ বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

ভিডিওতে কথোপকথনের একপর্যায়ে রুমিন ফারহানাকে ওসির অতীত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করতে শোনা যায়। তিনি ওসিকে উদ্দেশ করে বলেন, তিনি আগে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন এবং তাঁর অতীত সম্পর্কে তিনি জানেন। জবাবে ওসি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

ওসি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রে/প্তার না করার জন্য রুমিন ফারহানা তাঁকে চাপ দিতেন। এ বিষয়ে তিনি নোট করে রেখেছেন বলেও দাবি করেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে প্রকাশিত হয়নি। রুমিন ফারহানার পক্ষ থেকে এ নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যও প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে প্রকাশিত ক্লিপের ভিত্তিতে কোনো পক্ষের অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। নিরাপত্তাব্যবস্থা, ওসির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ এবং থানায় উপস্থিত লোকজনের ভূমিকা সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।