তিন দিন বন্ধ থাকার পর ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার Unit-2 আবার বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে ইউনিটটি চালু করার পর দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে গ্রিডের সঙ্গে এর সমন্বয় সম্পন্ন হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে কারিগরি সমস্যার কারণে Unit-2 বন্ধ হয়ে যায়। ইউনিটটি বন্ধ হওয়ার আগে গোড্ডা কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছিল। Unit-2 বন্ধ হওয়ার পর সরবরাহ নেমে প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াটে চলে যায়।
অর্থাৎ একটি ইউনিটের সমস্যাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আমদানি উৎস থেকে সরবরাহ এক লাফে প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহে তখন এমনিতেই চাপ ছিল। ফলে গোড্ডার দ্বিতীয় ইউনিটের পুনরায় চালু হওয়াকে স্বস্তির খবর হিসেবেই দেখছে বিদ্যুৎ খাত।
তবে এখানেই সামনে আসে বড় একটি প্রশ্ন—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির কাঠামো কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ?
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ আমদানির স্থাপিত সক্ষমতা ছিল ২ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ভেড়ামারা এইচভিডিসি দিয়ে ১ হাজার মেগাওয়াট, ত্রিপুরা থেকে ১৬০ মেগাওয়াট, নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট এবং ঝাড়খণ্ডের আদানি গোড্ডা কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট।
হিসাব করলে দেখা যায়, আমদানির মোট স্থাপিত সক্ষমতার প্রায় ৫৬ শতাংশই আদানি গোড্ডা কেন্দ্রের। ফলে বাংলাদেশ একমাত্র আদানি থেকেই বিদ্যুৎ নেয়—এমন নয়; কিন্তু আমদানি কাঠামোর সবচেয়ে বড় একক উৎস গোড্ডা। এ কারণেই কেন্দ্রটির উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন সরাসরি জাতীয় গ্রিডে প্রভাব ফেলতে পারে।
গোড্ডা কেন্দ্রটি দুটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট নিয়ে তৈরি। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আদানি পাওয়ারের চুক্তি অনুযায়ী, কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট নেট বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা রয়েছে। ২০১৭ সালে করা এই Power Purchase Agreement-এর মেয়াদ ২৫ বছর। কেন্দ্রটি ২০২৩ সালে পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আমদানি করা বিদ্যুতের গুরুত্বও বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আদানি গোড্ডা থেকে বাংলাদেশ ৮.৬৩ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেয়েছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৮.২ শতাংশ। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ১৫.৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
এর পেছনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটও একটি বড় কারণ। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এলএনজি সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে। আগস্টেও গ্যাস সংকটের কারণে সরকারকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়েছিল।
এই বাস্তবতায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি অতিরিক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা নয়, বরং বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আদানি কেন্দ্রের উৎপাদন তুলনামূলক বড় হওয়ায় গরমের মৌসুমে এর ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে। Unit-2 বন্ধ হওয়ার সময়ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রটি বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে energy security-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি ভারসাম্যের প্রশ্ন আছে। কোনো একটি বড় কেন্দ্র দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিকল্প উৎস থেকে সেই ঘাটতি কত দ্রুত পূরণ করা যাবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। গোড্ডার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক তিন দিনের ঘটনা দেখিয়েছে, একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিটের কারিগরি সমস্যাও সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি করতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, আমদানি করা বিদ্যুৎ নিজেই সীমান্তের বাইরের অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জাতীয় গ্রিডে উৎসের বৈচিত্র্য যত বেশি থাকবে, কোনো একটি কেন্দ্র বা আন্তঃসীমান্ত সংযোগে সমস্যা হলে পুরো ব্যবস্থাকে সামাল দেওয়া তত সহজ হবে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য বিকল্প উৎস বাড়ানোর প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত থেকে অন্যান্য সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানি, নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি, দেশীয় গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ভবিষ্যতের সঞ্চালন অবকাঠামো—সবগুলোকে সমন্বিত করেই দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ নিরাপত্তার কাঠামো তৈরি করতে হবে।
তবে আমদানির ওপর নির্ভরতা মানেই তা নেতিবাচক—এমন সিদ্ধান্তেও যাওয়া যায় না। আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য অনেক দেশের জন্যই সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার কার্যকর উপায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভারতের বিদ্যুৎ আমদানি ঘাটতির সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছে।
প্রশ্নটি তাই আদানির বিদ্যুৎ নেওয়া উচিত কি না—এখানে আটকে নেই। বরং প্রশ্ন হলো, একটি বড় উৎসে সমস্যা হলে বাংলাদেশ কত দ্রুত অন্য উৎস থেকে সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে।
গোড্ডার Unit-2 ফিরে আসায় আপাতত সরবরাহের ওপর চাপ কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই ঘটনা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনেছে—বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার পাশাপাশি উৎসের বৈচিত্র্য, সঞ্চালন সক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্য বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করাও energy security-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



