বাংলাদেশের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার এলইডি বাতির বাজারের ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পণ্য মানসনদ বা অনুমোদন ছাড়া বাজারজাত হচ্ছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, কম দামে বিক্রি হওয়া এসব পণ্য নিয়ম মেনে উৎপাদন বা আমদানি করা পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। একই সঙ্গে ক্রেতারা কম দামের সুবিধা নিতে গিয়ে অনেক সময় স্থায়িত্ব, বিদ্যুৎ খরচ ও বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়টি উপেক্ষা করছেন।
সম্প্রতি ঢাকার মগবাজারের একটি দোকান থেকে ১২০ টাকায় কেনা ২০ ওয়াটের একটি এলইডি বাতি এক মাসের মধ্যেই নষ্ট হওয়ার ঘটনা উঠে এসেছে। পণ্যটির গায়ে বিএসটিআই অনুমোদনের চিহ্ন, সিএম লাইসেন্স নম্বর, ওয়ারেন্টি, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা মেয়াদসংক্রান্ত তথ্য ছিল না। দোকানে একই ধরনের আরও কয়েকটি কম দামের ব্র্যান্ডের বাতিও বিক্রি হতে দেখা গেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, শুধু সাধারণ বাল্ব নয়—ব্র্যাকেট বা ডিটি টিউব লাইট, ডাউনলাইট, সারফেস প্যানেল, রিচার্জেবল এসি/ডিসি বাতি, স্মার্ট এলইডি, ফ্লাডলাইট, স্পটলাইট ও ডেকোরেটিভ লাইটের মতো বিভিন্ন পণ্যের মধ্যেও অনুমোদনহীন পণ্যের উপস্থিতি রয়েছে।
ওয়ালটন হাইটেক পার্কের ইলেকট্রিক্যালস বিভাগের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, বিভিন্ন ধরনের লাইটিং পণ্যের প্রায় ৪৫–৫০ শতাংশ নন-ব্র্যান্ডেড এবং বিএসটিআই অনুমোদনহীন। তাঁর মতে, এসব পণ্য মূলত দুটি পথে বাজারে আসে—চীন থেকে সম্পূর্ণ তৈরি বাতি বা উপকরণ আমদানি করে বিক্রি করা হয়, আবার কিছু উপকরণ আমদানি করে দেশে সংযোজন করেও বাজারজাত করা হয়।
মানহীন বা নিম্নমানের বাতির ক্ষেত্রে শুধু দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এলইডি বাতির বিদ্যুৎ সাশ্রয় নির্ভর করে এর এলইডি চিপ, ড্রাইভার ও অন্যান্য উপকরণের মানের ওপর। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার হলে একই আলো পেতে তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সোহেল রানা দাবি করেছেন, নিম্নমানের কিছু বাতির ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিল মানসম্মত পণ্যের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। তবে এই হিসাব সব অনুমোদনহীন পণ্যের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য—এমন কোনো সরকারি পরীক্ষার ফল প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
পণ্যের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআইয়ের ভূমিকা রয়েছে। সংস্থাটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক আলো পণ্যের পরীক্ষার জন্য তাদের আলাদা ল্যাবরেটরি রয়েছে এবং সেখানে এলইডি লাইটসহ বিভিন্ন ধরনের লাইটিং পণ্য নির্ধারিত বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক মানের আলোকে পরীক্ষা করা হয়।
বিএসটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, যেসব পণ্য বাধ্যতামূলক মানসনদের আওতায় পড়ে, সেগুলো উৎপাদন, আমদানি, বিপণন বা বিক্রির আগে নির্ধারিত মান অনুসরণ করে সনদ নেওয়ার বিধান রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া মানচিহ্ন ব্যবহার এবং বাধ্যতামূলক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন পণ্য বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার সুযোগও রয়েছে।
এলইডি লাইটিং পণ্যের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার একটি সাম্প্রতিক পদক্ষেপও রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে বিএসটিআই সাতটি নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে বিএসটিআই মানচিহ্ন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা চালু করে, যার মধ্যে এলইডি লুমিনেয়ারও রয়েছে। নতুন বিধানের আওতায় সংশ্লিষ্ট উৎপাদক ও আমদানিকারকদের নির্ধারিত বাংলাদেশি মান মেনে চলতে হবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন নিতে হবে।
ক্রেতাদের জন্য তাই শুধু বাতির গায়ে লেখা ওয়াট দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। প্যাকেট বা পণ্যে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ও সিএম লাইসেন্সের তথ্য, প্রস্তুতকারকের পরিচয়, ওয়ারেন্টি, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য এবং বিক্রয় রসিদ আছে কি না—এসবও দেখা জরুরি। আলো কতটা দেবে, সেটি বোঝার ক্ষেত্রে ওয়াটের পাশাপাশি লুমেনের তথ্য থাকলে সেটিও যাচাই করা যেতে পারে।
বাজারে সস্তা পণ্যের চাহিদার সুযোগে মানসনদহীন পণ্য ঢুকে পড়ার অভিযোগ শুধু ক্রেতার জন্য নয়, নিয়ম মেনে ব্যবসা করা উৎপাদকদের জন্যও প্রতিযোগিতার প্রশ্ন তৈরি করছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, মান বজায় রেখে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা, সনদ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ব্যয় বহন করলেও অনুমোদনহীন পণ্যের বিক্রেতারা সেই খরচ এড়িয়ে তুলনামূলক কম দামে পণ্য দিতে পারছেন।
ফলে এলইডি বাতি কেনার ক্ষেত্রে দামের সঙ্গে পণ্যের মান ও অনুমোদনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আর বাজারে বাধ্যতামূলক মানসনদের আওতাভুক্ত পণ্য নিয়ম মেনে বিক্রি হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি ও প্রয়োগের ওপরও নির্ভর করছে।




