জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। শুধু ২০২৫ সালেই অতিরিক্ত তাপের কারণে দেশে সম্ভাব্য শ্রম-আয় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। ল্যানসেট কাউন্টডাউনের ২০২৬ সালের স্বাস্থ্য ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে তাপের কারণে বছরে গড়ে ২৬ বিলিয়ন ঘণ্টার বেশি সম্ভাব্য কর্মসময় নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের বার্ষিক গড়ের তুলনায় এই ক্ষতি ৭১ শতাংশ বেশি।

বছরে নষ্ট হচ্ছে ২৬ বিলিয়ন কর্মঘণ্টা

ল্যানসেট কাউন্টডাউনের গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের কাজ করার শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে কৃষি, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবাখাতের যেসব কর্মীকে বাইরে বা গরম পরিবেশে কাজ করতে হয়, তাঁদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে।

তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করলে শরীরে পানিশূন্যতা, ক্লান্তি ও তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে স্বাভাবিক গতিতে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা কমাতে হয়, আবার কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে কাজে যেতে পারেন না।

বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত আয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষি উৎপাদন, নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়ে।

তবে গবেষণায় উল্লেখ করা ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারকে সরাসরি মানুষের পকেট থেকে হারিয়ে যাওয়া অর্থ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি তাপের কারণে শ্রমক্ষমতা কমে যাওয়ায় সম্ভাব্য আয়ের একটি গবেষণাভিত্তিক হিসাব। মূলত আনুষ্ঠানিক বেতনভিত্তিক কর্মক্ষেত্রের তথ্য ব্যবহার করে এই অনুমান করা হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক ও অবৈতনিক শ্রমের ক্ষতি এতে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত নয়।

শিশু ও প্রবীণদের ওপর বাড়ছে তাপপ্রবাহের প্রভাব

গবেষণায় শুধু কর্মক্ষম মানুষের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি নয়, শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা বছরে গড়ে ৭.৬ দিন তাপপ্রবাহের মধ্যে ছিল। ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের গড়ের তুলনায় এই সংখ্যা ১৬২ শতাংশ বেশি।

একই সময়ে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের তাপপ্রবাহে থাকার গড় সময় ছিল বছরে ৭.২ দিন। আগের নির্ধারিত সময়ের তুলনায় এটি ১৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থাৎ তাপপ্রবাহের প্রভাব এখন শুধু বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শিশু ও প্রবীণদের মতো শারীরিকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্যও পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।

তাপজনিত মৃত্যুর অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়ছে

প্রতিবেদনে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের তাপজনিত মৃত্যুর অর্থনৈতিক মূল্যায়নও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ ধরনের মৃত্যুর বার্ষিক গড় অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়েছে।

গবেষণার হিসাবে, এই মূল্য ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের তুলনায় প্রায় ৪৯৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব শুধু কর্মক্ষমতা ও আয় কমিয়ে দিচ্ছে না, মানুষের জীবনহানির অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়াচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) তাদের ২০২৬ সালের জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক মূল্যায়নে জানিয়েছে, তাপজনিত মৃত্যু, খরা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি আগের দশকের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে।

বায়ুদূষণেও বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি

ল্যানসেটের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মানবসৃষ্ট সূক্ষ্ম বস্তুকণা বা পিএম ২.৫ দূষণের কারণে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে আনুমানিক ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালে এসব মৃত্যুর ৩৭.৫ শতাংশের সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণের কারণে ২০২৩ সালে আনুমানিক ৭৭ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৭০০।

প্রতিবেদন বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা ৯.৯ শতাংশ বেশি কার্বননির্ভর হয়েছে। ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানিতে সরকারের নিট ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫.৩ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ৫২.৯ শতাংশের সমান।

ঢাকায় প্রকাশিত হলো ল্যানসেটের প্রতিবেদন

রোববার (১ নভেম্বর) ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইনে ল্যানসেট কাউন্টডাউনের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়।

অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সিথ্রি-ইআর)। এতে কারিগরি সহায়তা দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিট।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ অর্থনীতিবিদ ড. শৌর্য দাশগুপ্ত। তিনি ফন্ডাজিওনে সিএমসিসির পরিবেশ অর্থনীতিবিদ এবং গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো।

তিনি জানান, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাপের কারণে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২৬ বিলিয়ন ঘণ্টার বেশি সম্ভাব্য শ্রমসময় নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় এই ক্ষতি ৭১ শতাংশ বেশি।

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের তাগিদ

অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ল্যানসেট কাউন্টডাউনের প্রতিবেদন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।

সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. আতীক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য সরাসরি সম্পর্কিত। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কর্মজীবী মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে মা ও শিশুরাও বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, বাংলাদেশের অনেক মানুষের বাইরে কাজ করা ছাড়া বিকল্প নেই। ফলে তীব্র গরমের মধ্যেও তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

ল্যানসেট কাউন্টডাউনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মারিনা রোমানেলোও সতর্ক করেছেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে অগ্রগতি থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক পদক্ষেপ এখনো যথেষ্ট নয়।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ

ল্যানসেট কাউন্টডাউনের এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন আর শুধু ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা নদীভাঙনের বিষয় নয়। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ মানুষের কাজের সক্ষমতা, আয় এবং স্বাস্থ্যের ওপরও বড় চাপ তৈরি করছে।

বিশেষ করে কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষের জন্য তাপ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠছে। পাশাপাশি শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগাম সতর্কতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা প্রস্তুতি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য শ্রম-আয় ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে বড় অঙ্কে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর ভবিষ্যতের ক্ষতি অনেকটাই নির্ভর করবে।