জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, অতিরিক্ত তাপ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো ঝুঁকি দেশের কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হলেও দুর্যোগ মোকাবিলা ও অভিযোজনের ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ১৯৭০ সালের তুলনায় ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১০০ গুণ কমাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। তবে জলবায়ু ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিদ্যমান প্রস্তুতির পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

কৃষিতে বাড়ছে জলবায়ু ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে কৃষির সরাসরি সম্পর্ক থাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, খরা, অতিরিক্ত তাপ এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ুর পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি খাতের মোট দেশজ উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। একই সময়ে কৃষি, পানির সংকট ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাবে আগামী ৩০ বছরে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত হতে পারেন বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে লবণসহিষ্ণু ও খরাসহিষ্ণু ফসল, পানি সাশ্রয়ী কৃষি প্রযুক্তি, ফসলের বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকি বেশি

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদী ও সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার কারণে এসব এলাকার মানুষের বসতি, কৃষি ও পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জলবায়ু বরাদ্দ নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় বক্তারা উপকূলীয় পানি ব্যবস্থাপনাকে জলবায়ু অভিযোজনের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক বরাদ্দ এবং জলবায়ু খাতে ব্যয় বাড়ানোর দাবি ওঠে।

বন্যা ও নগর ঝুঁকি মোকাবিলা

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বড় ধরনের বন্যার ক্ষেত্রে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, অতিরিক্ত তাপ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুজনিত অভিবাসীদের চাপ মোকাবিলা করতে হবে। এজন্য জলবায়ু সহনশীল সড়ক, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, আবাসন, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য নাগরিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা

জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩ থেকে ২০৫০ গ্রহণ করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এই পরিকল্পনা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনের কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।

পরিকল্পনাটির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় উন্নয়ন পরিকল্পনা করা, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে শুধু পরিকল্পনা থাকলেই হবে না, প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের বাংলাদেশবিষয়ক জলবায়ু ও উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মধ্যমেয়াদে জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশের অন্তত ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

২০২৬ সালের বাজেট নিয়ে আলোচনাতেও জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বর্তমান বরাদ্দ দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে মত এসেছে। জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় এসেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে বাংলাদেশের জন্য শুধু অভিযোজন নয়, নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ তুলনামূলকভাবে কম, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে নিঃসরণও বাড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবহন ও জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বন, নদী, জলাভূমি ও উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে বন্যা, ঝড় ও তাপের প্রভাব কমাতে সহায়তা করে।

সুন্দরবনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল সংরক্ষণ, নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ভবিষ্যৎ জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার অংশ হতে পারে।

তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। শিক্ষার্থী, তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক, কৃষক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব ব্যবসা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি সংরক্ষণে তরুণদের নতুন উদ্যোগ ভবিষ্যতের সমাধান তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করাও প্রয়োজন।

এখন কী করণীয়

বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর মোকাবিলা কৌশল হতে পারে অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়নকে একই পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসা। কৃষিতে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, উপকূলীয় এলাকায় পানি ব্যবস্থাপনা, শহরে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও শিল্প, পানি সংরক্ষণ এবং প্রকৃতি রক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার ও জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকও স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রস্তুতি

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মানুষের বসবাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনাকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩ থেকে ২০৫০ বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সব প্রভাব বন্ধ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আগাম প্রস্তুতি, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সেই প্রস্তুতিই এখন সবচেয়ে জরুরি।