ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করাসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে গাজীপুর ও সাভারের শিল্পাঞ্চলে। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ ও কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিকেরা। পরিস্থিতির কারণে দুই জেলায় অন্তত ৮০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি পিকআপ ভ্যান ও পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে আ/গুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর বাজার, চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক ও তেলিচালা এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে বেতন বাড়ানোর দাবিতে স্লোগান দেন। একপর্যায়ে শত শত শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয় এবং যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকায় মহাসড়কের মাঝখানে থাকা দুটি পুলিশ বক্সে আ/গুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন জানান, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা পুলিশ বক্সের ভেতরের মালামাল বাইরে বের করে সেগুলোতেও আ/গুন দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শ্রমিকেরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন।

কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউন ও একটি পিকআপ ভ্যানে আ/গুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, ট্রপিক্যাল নামের একটি পোশাক কারখানার গোডাউনে আ/গুন দেওয়ার খবর তাঁরা পেয়েছেন। তবে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ঘটনাস্থলে যেতে সমস্যা হচ্ছিল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজনে সদস্যসংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে সাভারের আশুলিয়ায়ও শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন। পরে নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের কারখানার সামনে আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা। তাঁরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দেন। শিল্প পুলিশ তাঁদের সড়কের এক পাশে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানালে শ্রমিকেরা সরে দাঁড়ান।

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সকাল থেকে অধিকাংশ কারখানায় কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে নিশ্চিতপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএজ গ্রুপের একটি কারখানা এবং ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন। পরে শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন বলেন, কাজ বন্ধ রাখা কারখানার কয়েকজন শ্রমিক তাঁকে জানিয়েছেন, তাঁদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কেউ কথা বলেননি। বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দ্রুত তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

প্রথম দফার তথ্য অনুযায়ী, সাভারের অর্ধশতাধিক এবং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে কারখানা বন্ধের সংখ্যা বাড়তে পারে। শ্রমিকদের দাবি, মজুরি বাড়ানোর বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত ও তাঁদের অন্যান্য দাবির বিষয়ে স্পষ্ট আশ্বাস দিতে হবে।

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। এর আগের দিন শনিবার রাতেও কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ ও আনসার একাডেমির ৩ নম্বর ফটক এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকেরা। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে তাঁদের সরিয়ে দিলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগের মধ্যেও বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। কারখানা বন্ধ, মহাসড়ক অবরোধ ও বিভিন্ন স্থানে আ/গুনের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ও স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ, সরকার ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা কত দ্রুত এগোয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।