বিমান চলাচলের নিরাপত্তাকে শুধু পরিচালন ব্যয় হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন, মূল্যবান সম্পদ ও জাতীয় অগ্রগতি সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। তাঁর মতে, নিরাপদ বিমান চলাচল শুধু দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয় নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, যাত্রীদের আস্থা এবং বিমান চলাচল খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের যৌথ ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অষ্টম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সেফটি সেমিনার-২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে বিমানবন্দর, টার্মিনাল ও এয়ার নেভিগেশন ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিমান চলাচলের নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও আধুনিক করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ জন্য নতুন প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন শামছুল ইসলাম। একই সঙ্গে জাতীয় বিমান সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনও ফ্লাইট সেফটির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা, কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি বজায় রাখা এবং বিমান চলাচল খাতের টেকসই উন্নয়নে নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেশাগত শৃঙ্খলা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
‘টেকনোলজি, ট্রেনিং অ্যান্ড টিমওয়ার্ক: ক্রিয়েটিং আ ফিউচার-রেডি সেফটি মাইন্ডসেট’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সেমিনার ২৬ অক্টোবর শুরু হয়। তিন দিনের আয়োজনের বিভিন্ন অধিবেশনে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন, মানবিক উপাদান, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং মানুষ ও প্রযুক্তির সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপায় নিয়েও মতবিনিময় করেন।
সেমিনারে ২১টি দেশের সামরিক ও বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জর্ডান, মরক্কো, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, কাতার, কুয়েত, রাশিয়া, সুদান, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জিম্বাবুয়ের বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিরা এতে যোগ দেন। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও সেমিনালে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিভিন্ন এয়ারলাইনস, ফ্লাইং একাডেমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা ছিলেন।
বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ, নতুন ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ নিয়ে এ আয়োজনের বিভিন্ন অধিবেশনে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা নিরাপদ বিমান চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সেমিনারটি শেষ হয়। বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিরাপত্তা, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

