৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের গাড়ি ও পোশাক কারখানার যানবাহনে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরিস্থিতির কারণে গাজীপুরে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
সোমবার সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ ও সফিপুর এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের দাবি, বর্তমান ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। এ ছাড়া চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল ও কালো তালিকাভুক্তি বন্ধের দাবিও রয়েছে।
সকাল ১১টার দিকে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা এগিয়ে গেলে কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এ সময় শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য আহত হন। সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কয়েকটি অংশে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
অন্যদিকে দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরের নাওজোর এলাকায় পুলিশের একাধিক গাড়িতে ভাঙচুর ও আ/গুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সময় টেলিভিশনের প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা এবং ক্যামেরা ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসএ টেলিভিশনের এক ক্যামেরাপারসনও পায়ে আঘাত পেয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকাতেও সোমবার সকাল থেকে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিউএজ গ্রুপের একটি কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শেষে কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়।
বেলা ১১টা ১০ মিনিটের দিকে নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি পোশাক কারখানার কাভার্ডভ্যানে আ/গুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর ওই সড়কের পাশের বেশ কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনায় শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহমেদ ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও আশপাশের এলাকাতেও অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে শ্রমিকদের বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও মহাসড়কের যান চলাচলে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গাজীপুরে সোমবার সকালে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও শিল্প পুলিশের সদস্যরাও মাঠে রয়েছেন।
এর আগে রোববার (১ নভেম্বর) মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেদিন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৫২৯টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সোমবারও নতুন করে শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে সরকার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। নতুন বোর্ডের মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও শ্রমিকদের একাংশের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা কার্যকর হয়। বর্তমান আন্দোলনে শ্রমিকেরা এই মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। শ্রমিকদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে শিল্পসংশ্লিষ্টরা উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।