ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলন করেছেন তৈরি পোশাকশ্রমিকেরা। রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সং/ঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে এক দিনে ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।

সকালে মিরপুর-১০ গোলচত্বরে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। পরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে মিরপুর-১১, মিরপুর-১২, পল্লবী ও আশপাশের এলাকায়। যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী, অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রে/নেড ব্যবহার করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সং/ঘর্ষ হয় এবং কয়েকজন আ/হত হন।

মিরপুরের পাশাপাশি গাজীপুরের কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে নেমে আসেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর ও আ/গুনের ঘটনাও ঘটে। সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিকদের বিক্ষোভে যান চলাচল ও কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে রোববার ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এর আগে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ৩১৮টি কারখানা বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়েছিল। সময় ও হিসাব সংগ্রহের পর্যায়ভেদে এই দুই পরিসংখ্যানে পার্থক্য রয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মী কর্মস্থল ছাড়েন।

মিরপুরে সং/ঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১৯ জনকে আ/টক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে অন্তত ২০ জন আ/হত হওয়ার তথ্য এসেছে, যাঁদের মধ্যে চার থেকে পাঁচজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় আ/হত ও আ/টকের সংখ্যা এক নয়; তাই এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট এলাকার পৃথক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রমিকদের প্রধান দাবি, বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মাসিক মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, বাড়িভাড়া, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও বর্তমান আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল, কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনের মধ্যে রোববার শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। ছয় সদস্যের এই বোর্ড পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে কাজ করবে। বোর্ড গঠনের পর মন্ত্রী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তবে বোর্ডের সুপারিশে কত টাকা মজুরি নির্ধারিত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি, শ্রমিকদের দাবি এবং কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সরকার ও শিল্পমালিকদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে কারখানার মালিকদের সংগঠনগুলো উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের সময়সীমা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানি আদেশ সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্পের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া সর্বশেষ মজুরি কাঠামোতে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন মজুরি বোর্ডের সুপারিশের মাধ্যমে পরবর্তী মজুরি কাঠামো নির্ধারিত হবে। তবে শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি এবং মালিকপক্ষের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড কী সুপারিশ করে, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।