শিশু দিনে কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করছে, সেটিই ভাষা বিকাশের একমাত্র নির্ধারক নয়। স্ক্রিনে কী দেখছে, কনটেন্টের সঙ্গে কতটা সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে এবং সেই সময় অভিভাবক তার সঙ্গে কথা বলছেন কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ বলে উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায়।

‘Effect of using screen time in developing children's speech and language: Bangladesh context’ শীর্ষক গবেষণাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের এমফিল গবেষণা হিসেবে পরিচালিত হয়। গবেষক মো. জাহিদ হোসেন খান গবেষণাটি করেন অধ্যাপক হাকিম আরিফের তত্ত্বাবধানে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলের ৩ থেকে ৮ বছর বয়সী ৫০ শিশু এবং তাদের অভিভাবক ও পরিচর্যাকারী এই গবেষণায় অংশ নেন। প্রশ্নমালার পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর ৩০ মিনিটের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।

গবেষণায় দেখা যায়, ৪০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করে। আরও ২০ শতাংশ শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময় চার ঘণ্টার বেশি। ব্যবহৃত ডিভাইসের মধ্যে মোবাইল ফোন সবচেয়ে বেশি—৯০ শতাংশ শিশু এটি ব্যবহার করে; এরপর টেলিভিশন ৭০ শতাংশ এবং ট্যাবলেট ৫০ শতাংশ।

শিশুরা স্ক্রিনে কী দেখছে, সেখানেও একটি স্পষ্ট প্রবণতা পাওয়া গেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু মূলত কার্টুন বা অন্যান্য বিনোদনমূলক কনটেন্ট দেখে। গবেষণায় প্রায় ৬০ শতাংশ শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারকে নিষ্ক্রিয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে শিক্ষামূলক ও ইন্টার‌্যাকটিভ অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী যেসব শিশু এমন কনটেন্ট ব্যবহার করেছে, তারা নতুন শব্দ পুনরাবৃত্তি করেছে, প্রশ্ন করেছে এবং নতুন বাক্য তৈরির চেষ্টা দেখিয়েছে।

অন্যদিকে, যারা মূলত কার্টুন বা ইউটিউব ভিডিও দেখেছে, তাদের মধ্যে যোগাযোগের আগ্রহ তুলনামূলক কম দেখা গেছে। কিছু শিশুকে স্ক্রিন বন্ধ করতে বললে কান্না বা জেদ করার আচরণও পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকেরা।

৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুরা তারা কী দেখেছে, তা নিয়ে কথা বলতে পারলেও তাদের বাক্য গঠনে কিছু দুর্বলতা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ স্ক্রিনে কোনো কনটেন্ট দেখা এবং সেই কনটেন্ট থেকে ভাষা শেখার অভিজ্ঞতা এক বিষয় নয়।

গবেষণায় অভিভাবকদের ভূমিকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। মাত্র ২০ শতাংশ অভিভাবক নিয়মিতভাবে শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময় পাশে থাকেন। আর ৩০ শতাংশ অভিভাবক সক্রিয়ভাবে শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ করেন।

গবেষকেরা মনে করেন, ভাষা শেখার ক্ষেত্রে শিশুর সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিভাবক পাশে বসে একই কনটেন্ট দেখলে, শিশুকে প্রশ্ন করলে এবং তার প্রশ্নের উত্তর দিলে স্ক্রিন ব্যবহারের সময়টিও শেখার সুযোগে পরিণত হতে পারে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫০ শতাংশ অভিভাবক ও পরিচর্যাকারী মনে করেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর ভাষা বিকাশে ক্ষতিকর। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, তাদের মনে হয়েছে শিশুদের শব্দভাণ্ডার কমেছে। তবে ৬০ শতাংশই মনে করেন, সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে স্ক্রিন ভাষা শেখায় সহায়ক হতে পারে।

গবেষণার ফল আন্তর্জাতিক গবেষণার কিছু আগের ফলাফলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ৪২টি গবেষণা নিয়ে করা একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ভাষাগত দক্ষতার নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও শিক্ষামূলক কনটেন্ট ও অভিভাবকের সঙ্গে একসঙ্গে দেখার মতো মানসম্মত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ভালো ভাষাগত দক্ষতার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি মাত্র ৫০ শিশুর ওপর পরিচালিত হওয়ায় এর ফলকে সব শিশুর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং বাংলাদেশে শিশুদের ডিজিটাল ব্যবহার, কনটেন্টের মান এবং অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে আরও বড় পরিসরের গবেষণার প্রয়োজনীয়তাই এতে সামনে এসেছে।

গবেষণাটির মূল বার্তা তাই স্ক্রিন পুরোপুরি বন্ধ করা বা অবাধে ব্যবহারের পক্ষে নয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী সময়ের সীমা রাখার পাশাপাশি সে কী দেখছে, কনটেন্টে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে কি না এবং স্ক্রিনের বাইরে পরিবারের সঙ্গে কতটা কথা বলছে—এই তিন বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।