স্বাধীনতার পর কোন কূটনৈতিক সুযোগ হারিয়েছিল বাংলাদেশ? শেখ মুজিব ও জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন আলোচনা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কতটা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় তৎকালীন সরকারগুলোর ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকের পররাষ্ট্রনীতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী। তাঁর মতে, সে সময় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি, যার প্রভাব বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে পড়েছিল।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর চতুর্থ পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এ আলোচনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন লেখক ও গবেষক তুহিন খান।
জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছিল। তখন এসব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তাঁর দাবি, সঠিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ না করার কারণে বিদেশি অনেক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সেই পরিস্থিতির প্রভাব সামাল দিতে না পেরে দুর্ভিক্ষসহ বিভিন্ন সংকটের মুখে পড়ে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকের দ্বিতীয়ার্ধের পররাষ্ট্রনীতি তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের যেসব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ জড়িত ছিল, সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি দেশের বিপুল শ্রমশক্তির জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল নিয়ে সমালোচনা করে জহরত আদিব আরও বলেন, সে সময় দেশে গণতন্ত্রের অবনতি ঘটে এবং বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। তাঁর মতে, এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
পররাষ্ট্রনীতিকে গবেষণানির্ভর করার বিষয়েও জোর দেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, পররাষ্ট্রনীতি যেন কেবল কোনো নির্দিষ্ট নেতার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল না থাকে; বরং গবেষণা, বিশ্লেষণ ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. মো. আবদুল মান্নান বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারত নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছিল। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও জনগণের সংগ্রামকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচারে এমন ধারণা তুলে ধরা হতো, যেন ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছে। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আবদুল মান্নান আরও বলেন, স্বাধীনতার পর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্মকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র বিভক্ত হওয়ার ঘটনা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠা করাও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেন।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করতে গেলে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের শাসনামল বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ভারতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা নিয়ে সে সময়ের নাগরিকদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের সময় তরুণদের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন এহসান মাহমুদ। তিনি জানান, ‘হিজবুল বাহার’ নামের জাহাজে করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সমুদ্রসীমা পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়া হতো। এর মাধ্যমে তরুণদের দেশের সমুদ্রসীমা ও সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন ছিল পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য আবেদন করলেও চীনের ভেটোর কারণে তখন বাংলাদেশ সদস্য হতে পারেনি। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৪তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। একই সময়ে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জোটে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান জোরদারের উদ্যোগ দেখা যায়। তবে দুই সময়ের পররাষ্ট্রনীতির মূল্যায়নে কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি তৎকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কূটনৈতিক যাত্রার এই দুই পর্যায় নিয়ে সেমিনারে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন উঠে আসে। দেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস পর্যালোচনায় এসব বিষয় ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক কৌশল ও নীতিনির্ধারণের আলোচনাতেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
