দেশে মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তরের অংশ হিসেবে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ২জি সেবা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার রোডম্যাপ তৈরি করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ বাটন ফোন ব্যবহার করে আসা বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে নতুন প্রযুক্তির উপযোগী হ্যান্ডসেটে যেতে হবে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি মাসে বিটিআরসির কমিশন সভায় ‘টু-জি সানসেট রোডম্যাপ অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান’ নিয়ে আলোচনা করে পর্যায়ক্রমে পুরোনো প্রযুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে রোডম্যাপটি চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদনের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রাহকদের নতুন প্রযুক্তিতে যাওয়ার জন্য আড়াই বছর সময় দেওয়া হবে। অর্থাৎ এখনই ২জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবহারকারীদের ৪জি-সমর্থিত ফিচার ফোন বা স্মার্টফোনে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।

বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ২জি হ্যান্ডসেটের অরিজিনাল ডিজাইন ম্যানুফ্যাকচারার বা ওডিএম লাইসেন্স অনুমোদনের শেষ সময় নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি ২জি হ্যান্ডসেটের বাজারজাতকরণের অনুমোদনের শেষ সময় ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুন। এ ছাড়া আমদানি করা ২জি-নির্ভর আইওটি ও মেশিন-টু-মেশিন যন্ত্রপাতি ২০২৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ৪জি বা ভিওএলটিই প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ফিচার ফোন ব্যবহারকারীদের ওপর। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ছয় কোটির বেশি মানুষ এখনো এ ধরনের ফোন ব্যবহার করেন। তাঁদের অনেকের কাছে মোবাইল ফোন মূলত কথা বলা ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগের মাধ্যম। ফলে নতুন হ্যান্ডসেট কেনার বাড়তি খরচ বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের পরিসংখ্যানেও ফিচার ফোনের বড় বাজারের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত প্রায় ৩ কোটি ২৮ লাখ হ্যান্ডসেটের মধ্যে ২ কোটি ১২ লাখের বেশি ছিল ২জি ফিচার ফোন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত উৎপাদিত প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ হ্যান্ডসেটের মধ্যেও ২জি ফিচার ফোনের অংশ ছিল ৬৬ শতাংশের বেশি।

বিটিআরসি জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সাশ্রয়ী স্মার্টফোন ও ৪জি ফিচার ফোনের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকদের নতুন হ্যান্ডসেট কেনার খরচ কমাতে সরকারি ভর্তুকি, কর-সুবিধা এবং কিস্তিতে ফোন কেনার মতো বিভিন্ন সহায়তার প্রস্তাবও রোডম্যাপে রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি সহায়তায় কম দামের স্মার্টফোন সরবরাহ, ভিওএলটিই-সমর্থিত ফিচার ফোনে কর ছাড় এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের অর্থ ব্যবহার। তবে এসব প্রস্তাবের সবগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষের হাতে কম দামে স্মার্টফোন পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষক, রিকশাচালকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা যুক্ত করে স্মার্টফোনের কার্যকর মূল্য দুই থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে স্থানীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারীরা এই রূপান্তরের সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বাজারে এখনো কম দামের ফিচার ফোনের উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। পর্যাপ্ত সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত হওয়ার আগে ২জি ফোনের উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ হলে গ্রাহক এবং দেশীয় উৎপাদনশিল্প উভয়ই সমস্যায় পড়তে পারে।

মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জাকারিয়া শহীদ পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকল্প তৈরি না হলে অনেকে মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যেতে পারেন। পাশাপাশি বৈধ উৎপাদন ও সরবরাহ কমে গেলে অননুমোদিত বাজারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

বিটিআরসির পরিকল্পনায় পুরোনো ২জি প্রযুক্তির জন্য ব্যবহৃত তরঙ্গ পরবর্তী সময়ে ৪জি, ৫জি এবং অন্যান্য আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তিতে পুনর্বণ্টনের কথাও রয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান তরঙ্গের ব্যবহার উন্নত করা এবং আধুনিক মোবাইল সেবার পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এই রূপান্তর সফল করতে শুধু নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন যথেষ্ট নয়। নতুন হ্যান্ডসেটের দাম, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্কের প্রাপ্যতা, গ্রাহকদের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং জরুরি যোগাযোগসেবা সচল রাখার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সব মিলিয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে ২জি সেবা বন্ধের পরিকল্পনা দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন নির্দেশনা প্রকাশের পর এই পরিবর্তনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে।