যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা বহু বছর ধরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যতম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন অনেক বাংলাদেশি।

আইন, অর্থনীতি, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, পরিবেশ, উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের কাজের পরিচিতি তৈরি হয়েছে। এমন ১০ প্রভাবশালী বাংলাদেশি ব্যক্তিত্বের শিক্ষাজীবন ও কর্মক্ষেত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।

১. ড. কামাল হোসেন

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও আইনাঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ড. কামাল হোসেন যুক্তরাজ্যের University of Oxford থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন। জাতিসংঘের জীবনীতে তাঁর BA in Jurisprudence, Bachelor of Civil Law এবং International Law এ PhD ডিগ্রির তথ্য রয়েছে। তিনি ১৯৫৯ সালে Lincoln’s Inn থেকে Barrister হিসেবে পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে আইনমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২. অধ্যাপক রেহমান সোবহান

বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান Cambridge University থেকে Economics এ MA অর্জন করেন। Centre for Policy Dialogue এর তথ্য অনুযায়ী, ক্যামব্রিজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং Centre for Policy Dialogue বা CPD প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। বাংলাদেশের অর্থনীতি, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও উন্নয়ন নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা ও নীতিগত বিশ্লেষণ রয়েছে।

৩. জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী

বাংলাদেশের প্রকৌশল ও অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী University of Southampton থেকে Advanced Structural Engineering এ MSc এবং Structural Engineering এ PhD অর্জন করেন। BUET এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৬৪ সালে যুক্তরাজ্যে যান এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই তাঁর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।

দেশে ফিরে তিনি BUET এ শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হন। পদ্মা সেতুসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে তাঁর কারিগরি ভূমিকা ছিল। তিনি BRAC University এর প্রথম উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

৪. অধ্যাপক আইনুন নিশাত

পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের পরিচিত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত University of Strathclyde, Glasgow থেকে Civil Engineering এ PhD অর্জন করেন। BUET এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি Commonwealth Scholarship নিয়ে যুক্তরাজ্যে গিয়ে ১৯৮১ সালে PhD সম্পন্ন করেন।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা রয়েছে। তিনি IUCN Bangladesh এর Country Representative এবং BRAC University এর উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

৫. অধ্যাপক নায়লা কবির

নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য, শ্রমবাজার ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত গবেষক অধ্যাপক নায়লা কবিরের শিক্ষাজীবনের বড় অংশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত।

তিনি London School of Economics থেকে স্নাতক ও পিএইচডি এবং University College London থেকে মাস্টার্স করেন। বর্তমানে তিনি LSE এর Emeritus Professor of Gender and Development।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় নারী, দারিদ্র্য, শ্রম, জীবিকা ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন।

৬. অধ্যাপক তৌফিক হাসান

বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া বিজ্ঞানী অধ্যাপক তৌফিক হাসান University of Cambridge থেকে Electrical Engineering এ PhD অর্জন করেন। Cambridge Graphene Centre এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০০৯ সালে তাঁর PhD সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে Cambridge এর Professor of NanoEngineering হিসেবে কাজ করছেন।

গ্রাফিন, ন্যানোম্যাটেরিয়াল, সেন্সর, ফ্লেক্সিবল ইলেকট্রনিকস ও ফোটোনিক প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে। তিনি Cambridge Graphene Centre এর NanoEngineering গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

৭. লুৎফে সিদ্দিকী

অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে পরিচিত বাংলাদেশি ব্যক্তিত্ব লুৎফে সিদ্দিকী University of York থেকে Economics এ Bachelor এবং London School of Economics থেকে Master’s সম্পন্ন করেন।

তিনি বর্তমানে LSE IDEAS এর Visiting Professor in Practice। এর আগে UBS Investment Bank এ Global Head of Emerging Markets হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। LSE এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ওই দায়িত্বের মেয়াদ ছিল সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত।

৮. ড. ফাহমিদা খাতুন

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নীতি গবেষণায় পরিচিত নাম ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি University College London বা UCL থেকে Economics এ PhD এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Economics এ মাস্টার্স অর্জন করেছেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে। CPD জানিয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে নয় বছর Executive Director হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে তিনি Distinguished Fellow হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। একই সময়ে ড. নাজনীন আহমেদ CPD এর নতুন Executive Director হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন।

ম্যাক্রো অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন অর্থনীতি ও যুব কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর গবেষণা ও নীতিগত কাজ রয়েছে।

৯. অধ্যাপক মুস্তাক খান

বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুস্তাক খান University of Oxford থেকে Philosophy, Politics and Economics এ First Class degree এবং University of Cambridge থেকে Economics এ PhD অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি SOAS University of London এর Professor of Economics।

উন্নয়ন অর্থনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি, দুর্নীতি, শিল্পনীতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। Cambridge এ তিনি Development Studies এর সঙ্গে দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন।

১০. অধ্যাপক নাওমি হোসেন

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণার জন্য পরিচিত অধ্যাপক নাওমি হোসেনও যুক্তরাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। SOAS এর বর্তমান প্রোফাইল অনুযায়ী, তাঁর BA Oxford, MSc LSE এবং DPhil Sussex।

তিনি বর্তমানে SOAS University of London এর Global Research Professor এবং Development for Transformation Centre এর Director। বাংলাদেশের উন্নয়ন, দারিদ্র্য, জনসেবা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সমাজ নিয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

এই ১০ ব্যক্তিত্বের শিক্ষাজীবনে একটি সাধারণ দিক দেখা যায়। তাঁরা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে নিজেদের ক্ষেত্রে গবেষণা, পেশাগত দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই জ্ঞানকে বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক পরিসরে কাজে লাগিয়েছেন।

তবে যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সাফল্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের ওপর নির্ভর করে না। সঠিক বিষয় নির্বাচন, গবেষণার সুযোগ, বৃত্তি, পেশাগত লক্ষ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান প্রজন্মের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এসব ব্যক্তিত্বের শিক্ষাজীবন তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়, বরং উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনার একটি বাস্তব উদাহরণ।