বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠছে। জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব তথ্যভান্ডারেও ৩৩টি ইউরোপীয় দেশে উচ্চশিক্ষা, অর্থায়ন, বৃত্তি ও শিক্ষার্থী সহায়তার তথ্য পাওয়া যায়।

তবে ইউরোপে পড়াশোনার জন্য একটি দেশ সবার জন্য সমানভাবে উপযুক্ত নয়। বিষয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভাষা, বাজেট, বৃত্তির সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত দেশ নির্বাচন করতে হয়।

জার্মানিতে কম শিক্ষাব্যয়ের সুযোগ

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে জার্মানি অন্যতম পরিচিত উচ্চশিক্ষার গন্তব্য। দেশটির সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ স্নাতক এবং অনেক স্নাতকোত্তর কোর্সে সাধারণ টিউশন ফি নেই। তবে কিছু বিশেষ স্নাতকোত্তর কোর্স এবং নির্দিষ্ট রাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ফি প্রযোজ্য হতে পারে।

জার্মানিতে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি নয়, জীবনযাত্রার খরচের ব্যবস্থাও আগে থেকে করতে হয়। ২০২৬ সালের হিসাবে দেশটিতে পড়াশোনার জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে কমপক্ষে ১১ হাজার ৯০৪ ইউরো দেখানোর প্রয়োজন হতে পারে।

এ ছাড়া জার্মানির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে।

ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তির সুযোগ

ফ্রান্সেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৩ হাজার ৯০০টি সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও ভিসা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য সরকারি সংস্থা ক্যাম্পাস ফ্রান্স সহায়তা করে।

ফ্রান্সে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বৃত্তির সুযোগও রয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন বৃত্তি দেয় এবং ক্যাম্পাস ফ্রান্সের বৃত্তি অনুসন্ধান ব্যবস্থায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোম্পানি ও ফাউন্ডেশনের অর্থায়নের তথ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তাই ফ্রান্সে আবেদন করার আগে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্সের ভাষা, ভর্তি যোগ্যতা ও বৃত্তির শর্ত আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

নেদারল্যান্ডসে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ

নেদারল্যান্ডস আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় উচ্চশিক্ষা গন্তব্য। দেশটির সরকারি শিক্ষা তথ্যভান্ডারে বিভিন্ন ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত কোর্সের তথ্য পাওয়া যায়।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ২০২৬ থেকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নেদারল্যান্ডসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের স্নাতক কোর্সের গড় টিউশন ফি প্রায় ৯ হাজার থেকে ২০ হাজার ইউরো এবং স্নাতকোত্তর কোর্সে প্রায় ১২ হাজার থেকে ৩০ হাজার ইউরো। অবশ্য কোর্স ও বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে প্রকৃত ফি ভিন্ন হতে পারে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নেদারল্যান্ডসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বৃত্তিও রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নেদারল্যান্ডস বৃত্তিতে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ হাজার ইউরো সহায়তার সুযোগ রয়েছে। এটি পূর্ণ টিউশন ফি বৃত্তি নয়।

ফিনল্যান্ডে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে

ফিনল্যান্ড আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ২০২৬ সালের শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষে দেশটির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্সে প্রায় ২৮ হাজার ৮০০ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আবেদন করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ এসেছিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, নাইজেরিয়া, নেপাল, চীন ও ইরান থেকে।

ফিনল্যান্ডের সরকারি উচ্চশিক্ষা তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্সে সাধারণত টিউশন ফি দিতে হয়। এই ফি বছরে প্রায় ৮ হাজার থেকে ২০ হাজার ইউরো হতে পারে।

তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি কমানো বা বৃত্তির সুযোগ দিতে পারে। এসব বৃত্তি সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার খরচ বহন করে না।

ফিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো সাধারণ সরকারি পূর্ণ বৃত্তি নেই। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘ফিনল্যান্ড সরকারি সম্পূর্ণ বৃত্তি’ ধরনের দাবির বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

ইউরোপের বৃত্তির বড় সুযোগ এরাসমাস মুন্ডুস

ইউরোপে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত সুযোগগুলোর একটি হলো এরাসমাস মুন্ডুস যৌথ স্নাতকোত্তর কর্মসূচি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এসব কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারেন।

এই কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো একজন শিক্ষার্থী একই স্নাতকোত্তর কোর্সের অংশ হিসেবে একাধিক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারেন। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণ বৃত্তিও থাকতে পারে, যার মধ্যে পড়াশোনার ব্যয়, ভ্রমণ, ভিসা এবং জীবনযাত্রার জন্য সহায়তা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এরাসমাস মুন্ডুসের নতুন ৩৭টি যৌথ স্নাতকোত্তর কর্মসূচি নির্বাচিত হয়েছে এবং এসব কর্মসূচিতে ২০২৬ সালের শরৎকাল থেকে শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

বেশিরভাগ কর্মসূচিতে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের জন্য আবেদন সাধারণত অক্টোবর থেকে জানুয়ারির মধ্যে হয়ে থাকে। তবে প্রতিটি কোর্সের নিজস্ব সময়সীমা ও যোগ্যতা থাকে।

শুধু বৃত্তি নয়, মোট খরচ হিসাব করুন

ইউরোপে পড়াশোনার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের একটি সাধারণ ভুল হলো শুধু টিউশন ফি বিবেচনা করা। বাস্তবে আবাসন, খাবার, যাতায়াত, স্বাস্থ্যবিমা, ভিসা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন খরচও মোট বাজেটের বড় অংশ।

দেশভেদে এসব খরচে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব শিক্ষা তথ্যভান্ডারেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, অর্থায়ন, বৃত্তি, আবাসন, বিমা এবং শিক্ষার্থী ভিসার বিষয়গুলো আগেই যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তাই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় বাছাইয়ের সময় শুধু ‘কম টিউশন ফি’ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পুরো শিক্ষাজীবনের সম্ভাব্য ব্যয় হিসাব করা উচিত।

আবেদন করার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন

ইউরোপের কোনো দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি।

প্রথমত, নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সংশ্লিষ্ট কোর্সের জন্য গ্রহণযোগ্য কি না দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোর্সটি কোন ভাষায় পরিচালিত হয় এবং ভাষাগত যোগ্যতার কী শর্ত রয়েছে, তা যাচাই করতে হবে।

এরপর টিউশন ফি, জীবনযাত্রার খরচ, বৃত্তি, আবেদনের শেষ সময়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং শিক্ষার্থী ভিসার নিয়ম জানতে হবে।

এ ছাড়া ডিগ্রি শেষ করার পর কাজ বা উচ্চতর পড়াশোনার সুযোগ কেমন, সেটিও বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের সরকারি তথ্য থেকে যাচাই করা উচিত।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোন দেশ উপযুক্ত

সব শিক্ষার্থীর জন্য একই দেশ সেরা নয়। যাদের প্রধান বিবেচনা তুলনামূলক কম শিক্ষাব্যয়, তাদের জন্য জার্মানির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আকর্ষণীয় হতে পারে। আবার বৃত্তি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগ খুঁজলে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনা করা যেতে পারে।

যারা একাধিক ইউরোপীয় দেশে পড়াশোনার সুযোগ চান, তাঁদের জন্য এরাসমাস মুন্ডুসের যৌথ স্নাতকোত্তর কর্মসূচি বিশেষভাবে নজরে রাখার মতো। এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় একসঙ্গে যুক্ত থাকে এবং নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণ বৃত্তির সুযোগও রয়েছে।

সবশেষে, ইউরোপে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভর্তি যোগ্যতা, টিউশন ফি, বৃত্তি ও ভিসার নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তাই শুধু কোন দেশ জনপ্রিয় তা দেখার চেয়ে নিজের বিষয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বাজেট ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে কোন দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি মানানসই, সেটি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।