পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি শরীয়তপুরের দুই সেতু, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ
শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীর ওপর নির্মাণাধীন দুটি সেতুর কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। শরীয়তপুর সদর উপজেলার প্রেমতলা ও জাজিরা উপজেলার কাজীরহাটে সেতু দুটির নির্মাণকাজ প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দা, গণপরিবহনের যাত্রী ও বিভিন্ন গন্তব্যের মানুষকে।
সেতু দুটি চালু হলে শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু নির্মাণকাজ আটকে থাকায় সেই সুবিধা পাচ্ছেন না মানুষ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পথে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মানুষ চলাচল করেন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০টি যানবাহন চলাচল করে, যার মধ্যে আড়াই শতাধিক যাত্রীবাহী বাস রয়েছে।
৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প, কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে
শরীয়তপুর শহর থেকে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের নাওডোবা পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে নতুন সেতু দুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২০ সালে অনুমোদিত ওই সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মোট ব্যয় ছিল ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। এর আওতায় প্রেমতলায় ১৯০ মিটার এবং কাজীরহাটে ১৫০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের জন্য ৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
২০২১ সালের ১ এপ্রিল জামিল ইকবাল লিমিটেড ও মোজাহারুল এন্টারপ্রাইজকে যৌথভাবে সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও সেতু দুটি যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত হয়নি।
এক সেতুর ৬০, অন্যটির ৮০ শতাংশ কাজ শেষ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রথম আলো জানিয়েছে, কাজীরহাট সেতুর প্রায় ৬০ শতাংশ এবং প্রেমতলা সেতুর প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এরপর থেকে প্রায় দুই বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।
কাজীরহাটে সেতুর মূল কাঠামোর কিছু অংশ নির্মিত হলেও বাকি কাজ অসমাপ্ত পড়ে আছে। অন্যদিকে প্রেমতলা সেতুর মূল কাঠামোর বেশির ভাগ কাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক, রেলিং এবং বিভিন্ন সেবা লাইনের কাজ বাকি রয়েছে। ফলে কোনো সেতুই এখনো ব্যবহার উপযোগী হয়নি।
কেন আটকে আছে নির্মাণকাজ
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরে নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত কাজের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তিমূল্যের বাইরে আরও ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা চেয়ে আবেদন করেছে।
৫৮ কোটি টাকার মূল চুক্তির বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ৪৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার বিল নিয়েছে। সেতু দুটির কাজ শেষ করার সময়সীমা তিন দফা বাড়ানো হয়েছে। চতুর্থবার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী কিংশুক মণ্ডল প্রথম আলোকে জানান, করোনাকালে কার্যাদেশ পাওয়ার পর কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়। এরপর ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও অতিরিক্ত কাজের কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ শেষ করা যায়নি। ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে বাকি কাজ শেষ করে সেতু দুটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সওজ
শরীয়তপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মনোয়ারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দ্রুততম সময়ে সেতু দুটির নির্মাণকাজ শেষ করে ব্যবহার উপযোগী করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
অর্থাৎ, প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার বিষয়টি এখন অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমোদনসহ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে সেতু দুটি কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করা যায়নি।
পুরোনো সেতুতে যানজট ও নিরাপত্তাঝুঁকি
নতুন সেতু নির্মাণ শেষ না হওয়ায় ১৯৯১ সালে নির্মিত পুরোনো সেতু দুটি দিয়েই যানবাহন চলাচল করছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সেতুগুলোর বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও সেতুর মেঝে ও রেলিং থেকে রড বেরিয়ে এসেছে। সেতু সরু হওয়ায় এক দিক থেকে যানবাহন উঠলে বিপরীত দিকের যানবাহনকে অপেক্ষা করতে হয়। এতে প্রায়ই যানজট তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা-শরীয়তপুর পথে চলাচলকারী বাসচালক লোকমান হোসেন প্রথম আলোকে জানান, কাজীরহাটের যানজটে আটকে পড়ায় শরীয়তপুর থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী যেতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনও ওই এলাকায় যানজটে অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
কবে শেষ হবে সেতু নির্মাণ
পদ্মা সেতু চালুর পর শরীয়তপুর থেকে রাজধানীতে সড়কপথে যাতায়াত বেড়েছে। এই যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে নেওয়া প্রকল্পের দুটি সেতু দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত থাকায় স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশিত সুবিধা ব্যাহত হচ্ছে।
এখন প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমোদন, নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু এবং সেতু দুটি চালুর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা জরুরি। একই সঙ্গে বারবার মেয়াদ বাড়ানোর পরও কেন কাজ শেষ হয়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিও প্রয়োজন। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ হলে যাত্রীদের সময় বাঁচবে, যানজট কমবে এবং পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর ওপর নির্ভরতা কমবে।




