নওগাঁ জেলা কারাগারে বন্দি অবস্থায় অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন নবাব। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে জাকির হোসেনকে হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন নওগাঁ জেলা কারাগারের জেল সুপার রত্না রায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়ার পর বেলা পৌনে ১২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক রেহনুমা মুনমুন স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, জাকির হোসেনকে হাসপাতালে আনার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের অভিযোগ, দেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা
জাকির হোসেনের ছেলে জোবায়েদ আল ফাহাদের অভিযোগ, তাঁর বাবা উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সমস্যায় ভুগছিলেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হলেও কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে সেগুলো খেতে দেয়নি।
ফাহাদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কারাগারের খাবার খেয়ে অসুস্থ বোধ করার কথাও তাঁর বাবা পরিবারকে জানিয়েছিলেন। গত শুক্রবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল। তখন তিনি সুস্থ ছিলেন বলে দাবি করেন ছেলে।
পরিবারের অভিযোগ, কারাগারে থাকাকালে জাকির হোসেনকে মানসিকভাবেও চাপে রাখা হয়েছিল। যথাযথ চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা হলে তাঁর মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন স্বজনেরা।
অভিযোগ অস্বীকার কারা কর্তৃপক্ষের
কারা কর্তৃপক্ষ পরিবারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। জেল সুপার রত্না রায় বলেন, জাকির হোসেনের চিকিৎসায় কোনো অবহেলা করা হয়নি। তাঁকে নির্ধারিত ওষুধ না দেওয়ার কোনো কারণ ছিল না।
কারাগারে তাঁর ওপর নির্যাতনের অভিযোগও অস্বীকার করেন জেল সুপার। তাঁর দাবি, প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে থাকলেও খাবারের কারণে অসুস্থ হওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি।
জাকির হোসেনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি কারা সুপার। সকালে তাঁর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা শুনেছেন বলে জানান তিনি।
হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য চিকিৎসকের
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে নওগাঁ পুলিশ লাইনস হাসপাতালের চিকিৎসক কৌশিক আহমেদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, জাকির হোসেন হৃদ্রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সকালে হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ দেখা দিলে তাঁকে নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানান ওই চিকিৎসক।
তবে পরিবারের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এবং কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিস্ফোরক মামলায় বন্দি ছিলেন জাকির হোসেন
জাকির হোসেন নবাব বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনি বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি বগুড়া জেলা জজ আদালতের সাবেক অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি ছিলেন।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের একটি মামলায় বন্দি ছিলেন তিনি। এর আগে তাঁকে বগুড়া জেলা কারাগার থেকে নওগাঁ জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
ময়নাতদন্তের অপেক্ষায় পরিবার
জাকির হোসেনের মৃত্যুর পর সুরতহাল সম্পন্ন করা হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে পরিবারের তোলা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারা হেফাজতে থাকা একজন বন্দির চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তাই জাকির হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ এবং কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
