যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর বিশ্ব তেলবাজারে দেখা দিয়েছে নিম্নমুখী প্রবণতা। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান হতে পারে, এমন প্রত্যাশায় টানা চতুর্থ দিনের মতো কমেছে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ৮২ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম কমে দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ৯২ ডলারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় ৪টা ২৬ মিনিটে ব্রেন্টের দাম আগের দিনের তুলনায় ৮৫ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমে ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এর আগের দিন বুধবার (৪ নভেম্বর) দুই ধরনের তেলের দামই ৮ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। সেদিন ব্রেন্টের দাম কমে ৯৪ দশমিক ৬২ ডলার এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৮৮ দশমিক ১২ ডলারে নেমেছিল। উভয় বেঞ্চমার্কের দাম ৩১ আগস্টের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।

নির্বাচনের ফল কীভাবে প্রভাব ফেলল তেলের বাজারে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ফল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে ফেলেছে। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, কংগ্রেসে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে বাড়তি রাজনৈতিক ও আর্থিক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফলের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন দুটি পথ রয়েছে। একদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটানো, অন্যদিকে সামরিক চাপ বাড়িয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলা। বাজারের বিনিয়োগকারীরা আপাতত কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

উপসাগরীয় অঞ্চলের সরকারি মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা আগের তুলনায় কম মনে হচ্ছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ায় সমঝোতার পথে যাওয়ার প্রণোদনাও বাড়তে পারে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কা কি সত্যিই কমেছে?

তেলের দাম কমলেও ইরান যুদ্ধের ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে গেছে, এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। কারণ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে না। নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হবে আগামী ৩ জানুয়ারি। অর্থাৎ এর আগ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে বিদ্যমান নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

বাজার বিশ্লেষকদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার পথ এখনো বেশ কঠিন। কাতার মধ্যস্থতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনো সমঝোতা থেকে অনেক দূরে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি বা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে আশাবাদ তৈরি হলেও নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

নতুন হিসাবেও সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপ বৃহস্পতিবার তাদের পূর্বাভাসে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে ইরানে হামলা চালানোর সম্ভাবনা ৬৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬০ শতাংশ করেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির সম্ভাবনাও ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার সম্ভাবনা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ সামরিক হামলার ঝুঁকি কিছুটা কমলেও দ্রুত শান্তিচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা এখনো সীমিত।

ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ থেকে ১২৫ ডলারের মধ্যে পৌঁছাতে পারে। ফলে বর্তমান দরপতনকে স্থায়ী মূল্যহ্রাসের সংকেত হিসেবে দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকেরা।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বাড়ছে

তেলের দাম কমার পেছনে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের প্রভাব নয়, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিও ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। বিশ্লেষকদের হিসাবে, এই পথ দিয়ে অপরিশোধিত তেলের চালান প্রায় যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি ফিরেছে। তবে পরিবহন ব্যয় এখনো বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ফলে সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ব তেলবাজারে দৈনিক ১১ লাখ ব্যারেল এবং অক্টোবরে ১৪ লাখ ব্যারেল উদ্বৃত্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় বাজারে তেলের দাম কমার চাপ তৈরি হয়েছে। তবে যুদ্ধের কারণে আগে ব্যাহত হওয়া সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

তেলের দাম আরও কমবে, নাকি আবার বাড়বে?

বিশ্ববাজারে টানা চার দিনের দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি করলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হতে পারে।

এ ছাড়া বড় তেল ব্যবহারকারী দেশগুলোর বাণিজ্যিক মজুত গত ১৫ বছরের মধ্যে নিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেল, পেট্রল ও ডিজেলের মজুত কমেছে। একই সময়ে জ্বালানির চাহিদা এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। আপাতত বাজারে যুদ্ধের ঝুঁকি কমার প্রত্যাশা কাজ করলেও সংঘাতের অবসান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেলের দামে অস্থিরতা থাকার আশঙ্কা রয়েছে।