যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারীর অবস্থান হারিয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম সাত মাস পর্যন্ত চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও আগস্টের হিসাব যুক্ত হওয়ার পর তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে দেশটি। নতুন পরিসংখ্যানে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠেছে চীন। আর শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম।
বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩৯ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।
অন্যদিকে একই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬৩ কোটি ৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। অর্থাৎ আট মাসের হিসাবে বাংলাদেশের তুলনায় চীনের রপ্তানি প্রায় ২৩ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বেশি। চীনের রপ্তানিও গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে মোট রপ্তানি আয়ে দেশটি বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে।
অটেক্সার তথ্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চীনের রপ্তানি কমার হার নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। একটি হিসাবে ৩৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং অন্য হিসাবে ২৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ পতনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুই হিসাবেই চীনের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমার তথ্য পাওয়া যায়।
এর আগে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসের হিসাবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশ ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। বিপরীতে চীনের রপ্তানি ছিল ৪৫৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ জুলাই পর্যন্ত চীনের তুলনায় প্রায় ১০ কোটি ৩২ লাখ ডলার এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ।
তবে আগস্টের হিসাব যুক্ত হওয়ার পর বদলে যায় অবস্থান। ওই মাসে চীনের রপ্তানি বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় আট মাসের মোট হিসাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে দেশটি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ এক ধাপ পিছিয়ে যায়।
এদিকে আট মাসের হিসাবে রপ্তানি কমলেও শুধু আগস্ট মাসে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক খবর রয়েছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের। গত বছরের একই মাসে এই রপ্তানি ছিল প্রায় ৬৬ কোটি ৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ একক মাসের হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক সরবরাহে শীর্ষ অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামও চলতি বছর কিছুটা পিছিয়েছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশটি প্রায় ১ হাজার ৯৭ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ কম। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা চীন ও বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনামের রপ্তানি অনেক বেশি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানিতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে মার্কিন ব্যবসায়ীরা মোট ৪ হাজার ৯০৭ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি ছিল ৫ হাজার ৩০০ কোটি ৮২ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ।
শুধু বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানি কমেছে এশিয়ার আরও কয়েকটি বড় সরবরাহকারী দেশের। চীন ও ভারতের রপ্তানিতে বড় পতন দেখা গেছে। পাকিস্তান এবং ভিয়েতনামের রপ্তানিও কমেছে। তবে একই সময়ে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ফলে মার্কিন বাজারে চাহিদা, ক্রয়াদেশ কিংবা আমদানিনীতিতে পরিবর্তন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য উত্থান-পতন দেখা গেছে। ২০২২ সালে রপ্তানি বেড়ে ৯৭৩ কোটি ডলারে পৌঁছায়। পরের বছর তা প্রায় ২৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৭২৯ কোটি ডলারে। ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে রপ্তানি হয় ৭৩৪ কোটি ডলার। এরপর ২০২৫ সালে প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে রপ্তানি আয় পৌঁছায় ৮২০ কোটি ডলারে।
তবে চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিও চাপের মুখে পড়েছে। বাজারে চাহিদার দুর্বলতা, শুল্কসংক্রান্ত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার প্রতিযোগিতা রপ্তানিকারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের হার কম। প্রতিযোগী চীন ও ভারতের তুলনায়ও বাংলাদেশের পতনের হার অনেক কম।
রপ্তানির পরিমাণের পাশাপাশি পোশাকের সংখ্যার হিসাবেও বাংলাদেশ পিছিয়েছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৭৫ কোটি ৫৬ লাখ পিস পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮০ কোটি ৫৩ লাখ পিস। অর্থাৎ পিস হিসেবে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দ্বিতীয় স্থান হারানো বাংলাদেশের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবর্তন হলেও আগস্টে রপ্তানি বৃদ্ধির তথ্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন বছরের বাকি মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ক্রয়াদেশের গতি, পোশাকের চাহিদা এবং চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের পরবর্তী অবস্থান।
