চীনের বিশাল ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপস্থিতি বাড়াতে অন্তত ২০টি স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বিসিসিসিআই। সংগঠনটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে এসব প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপন করে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে তৈরি পণ্য তুলে ধরা হবে।

১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খানের সঙ্গে বৈঠকে বিসিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এ প্রস্তাব দেয়। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে মোট ছয়টি লিখিত প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দেওয়া হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটেও আতাউর রহমান খানকে বর্তমান বাণিজ্যসচিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিসিসিসিআইয়ের মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের তুলনায় দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ এখনো অনেক কম। সংগঠনটির প্রস্তাবনায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার হলেও চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলারের নিচে থাকার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিসিসিসিআই সভাপতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে ২০২৫ থেকে ২৬ অর্থবছরের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছেন। সংখ্যার পার্থক্যটি মূলত রাউন্ডিংয়ের কারণে।

এই বড় ব্যবধান কমাতে চীনে বাংলাদেশি পণ্যের ব্র্যান্ডিং আরও দৃশ্যমান করার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের ধারণা, স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র থাকলে চীনা আমদানিকারক, পরিবেশক ও ক্রেতারা সারা বছর বাংলাদেশি পণ্য সরাসরি দেখার সুযোগ পাবেন। ফলে শুধু বাণিজ্য মেলার কয়েক দিনের প্রচারের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি বাজার যোগাযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবের এই উদ্দেশ্যের কথা বিসিসিসিআই তাদের লিখিত সুপারিশে তুলে ধরেছে।

চীনের বড় বাণিজ্য মেলা ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসেও যোগ্য বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানি সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, পণ্যের মান ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের কথা বলেছে বিসিসিসিআই।

প্রস্তাবে কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত দশম চীন দক্ষিণ এশিয়া এক্সপোর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মেলায় বাংলাদেশের ১০১টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণকে আরও পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ দেখছে সংগঠনটি।

স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্রের পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংকের শাখা চালুর প্রস্তাবও দিয়েছে বিসিসিসিআই। সংগঠনটির সভাপতি খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, চীনের কয়েকটি ব্যাংক বাংলাদেশে শাখা স্থাপনে আগ্রহী এবং কুনমিং সফরের সময় একটি চীনা ব্যাংকের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

খোরশেদ আলমের মতে, সরাসরি চীনা ব্যাংকের উপস্থিতি থাকলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের আর্থিক লেনদেন আরও সহজ ও দ্রুত হতে পারে। তবে বাংলাদেশে কোনো চীনা ব্যাংকের শাখা চালুর অনুমোদন হয়েছে এমন কোনো সরকারি ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ বিষয়টি বর্তমানে ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রস্তাবের পর্যায়েই রয়েছে।

বিসিসিসিআইয়ের ছয় দফার আরেকটি অংশে বাংলাদেশ চীন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য চীনের সহায়তায় একটি বাংলাদেশ চীন টেকনিক্যাল অ্যান্ড পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রস্তাবও রয়েছে।

বৈঠকে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিসিসিসিআইয়ের অভিযোগ, শুল্ক সুবিধায় আমদানি করা কিছু পণ্য অননুমোদিতভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়ায় নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের অনিয়ম সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও নিরুৎসাহিত করতে পারে।

এ কারণে বন্ড সুবিধার তদারকি ও আইন প্রয়োগ আরও জোরদারের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে চীনের বাজারে রপ্তানি বাড়ানো, প্রধান বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশের উপস্থিতি শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বৈঠকে বিসিসিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জিংচাও ও এ জেড এম আজিজুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল জামিলুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক মো. আবু তাহেরও উপস্থিত ছিলেন।

তবে চীনে ২০টি স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো কোনো চূড়ান্ত অনুমোদন বা বাস্তবায়ন সময়সূচি ঘোষণা করেনি। ফলে আপাতত এটি বিসিসিসিআইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। এখন মূল প্রশ্ন হলো, সরকার প্রস্তাবটি গ্রহণ করলে কোন শহরে কেন্দ্রগুলো হবে, কীভাবে পরিচালিত হবে এবং সেখানে কোন কোন বাংলাদেশি পণ্য অগ্রাধিকার পাবে।