শেয়ারবাজারে কারসাজি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে গত দুই বছরে স্থগিত করা কিছু বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবে শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) কমিশনের এক সভায় নির্দিষ্ট শর্তে এসব হিসাবের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অনুমোদন পাওয়া বিও হিসাবধারীরা শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন। প্রয়োজনে এসব হিসাবে নতুন অর্থ জমা এবং মার্জিন ঋণ সমন্বয়েরও সুযোগ থাকবে। তবে হিসাব থেকে কোনো অর্থ উত্তোলন কিংবা অন্য হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে না।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কয়েকজন বিনিয়োগকারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই করে নির্দিষ্ট কিছু বিও হিসাবের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কতটি বিও হিসাব সচল হবে

বিএসইসির মুখপাত্র জানিয়েছেন, ঠিক কতটি বিও হিসাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের আবেদন পর্যালোচনা করে যোগ্য হিসাবগুলো নির্বাচন করা হবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব হিসাবে শুধু শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ থাকবে। কোনো অর্থ উত্তোলন কিংবা লিংক অ্যাকাউন্ট বা অন্য কোনো মাধ্যমে শেয়ার স্থানান্তর করা যাবে না।

অর্থাৎ, হিসাবগুলো আংশিক সচল হলেও সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা তাঁদের অর্থ বা সম্পদ ইচ্ছামতো সরিয়ে নিতে পারবেন না।

দুই বছরে ছয় শতাধিক বিও হিসাব জব্দ

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেয়ারবাজারে কারসাজি, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তির বিও হিসাব স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিএসইসি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে এসব হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছিল।

বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ছয় শতাধিক বিও হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও রয়েছে।

সব জব্দ হিসাবের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত কার্যকর নয়

বিএসইসির নতুন সিদ্ধান্তে সব জব্দ বিও হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সচল হচ্ছে না। যেসব বিনিয়োগকারী আবেদন করেছেন, তাঁদের হিসাবের বিষয়ে পৃথকভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হিসাবের ক্ষেত্রে বিএসইসির এককভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, আদালতের আদেশে অবরুদ্ধ করা হিসাবের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।

এ ছাড়া যেসব হিসাবের বিষয়ে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা বিবেচনায় নিতে হবে।

কেন শিথিল করা হচ্ছে লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা

বিএসইসির সিদ্ধান্তের পেছনে বিনিয়োগকারীদের আবেদনের পাশাপাশি আটকে থাকা বিনিয়োগ ও মার্জিন ঋণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বিএসইসির এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব হিসাবে মার্জিন ঋণের মাধ্যমে দেওয়া অর্থ দীর্ঘদিন আটকে রয়েছে। অনিয়মের অভিযোগে বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থও অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা যুক্তিসংগত নয় বলে মনে করছে কমিশনের একটি অংশ।

তবে বাজারসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের আশঙ্কা, অর্থ উত্তোলনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকি থাকতে পারে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে কম দামে শেয়ার বিক্রি কিংবা ব্লক মার্কেটে লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সরানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা সতর্ক করেছেন।

বিনিয়োগকারীদের জন্য কী পরিবর্তন আসছে

নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে অনুমোদিত বিনিয়োগকারীরা তাঁদের স্থগিত হিসাব ব্যবহার করে আবার শেয়ারবাজারে লেনদেন করতে পারবেন। পাশাপাশি আগে থেকে থাকা মার্জিন ঋণ সমন্বয়ের সুযোগও পাবেন।

তবে অর্থ উত্তোলন ও সম্পদ স্থানান্তরের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় এসব হিসাব পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে না। তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থ উত্তোলনের ওপর বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এখন বিএসইসির পরবর্তী নির্দেশনা, কোন কোন হিসাব এই সুবিধার আওতায় আসবে এবং কীভাবে শর্তগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, সেদিকেই নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা।

পুঁজিবাজারে স্বাভাবিক লেনদেনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের তদন্তের স্বার্থ রক্ষা করাই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে বড় বিবেচ্য বিষয়।