আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাজার পুনরুজ্জীবিত ও আরও গভীর করতে একটি সমন্বিত সংস্কার উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
রোববার ৪ অক্টোবর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বিএসইসি এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনস, আইওএসসিও।
অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং পুরো আর্থিক কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে। তার ভাষায়, “আমরা সামগ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ, আগামী এক বছরের মধ্যে আপনারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত চেহারা দেখতে পাবেন।”
তিনি জানান, বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অটোমেশন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু কাঠামো তৈরি করলেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য কিছু কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাংকনির্ভরতা কমানোর ওপরও জোর দেন। তার মতে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য শুধু উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর না করে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের গভীরতাও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা আইএমএফের অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বদলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহের নতুন পথ খুঁজছে সরকার। ডলার বন্ড, পাণ্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড এবং স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক বন্ডসহ বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ ব্যবহারের প্রস্তুতির কথা জানান অর্থমন্ত্রী।
পুঁজিবাজার সংস্কারে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং অন্যান্য বাজার অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।
স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের বিষয়টিও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোরতা নয়, বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও স্বনিয়ন্ত্রণ, পেশাগত সততা এবং সঠিক তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি ও দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন ও ভুল উপস্থাপনার কারণে দুর্বল প্রতিষ্ঠান বাজারে প্রবেশ করেছে, আর এতে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোও তালিকাভুক্ত হতে নিরুৎসাহিত হয়েছে।
বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের এবারের প্রতিপাদ্য বিনিয়োগকারীর স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল প্রতারণা ও প্রতারণা বিষয়ে সতর্কতা। অনুষ্ঠানে বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর বাজার, আর্থিক সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়ও গুরুত্ব পায়।
অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। এই আস্থা ধরে রাখতে হলে বাজারে স্বচ্ছতা, সুশাসন, নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন এবং শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করতে হবে বলেও তিনি মত দেন।
সরকারের লক্ষ্য এখন পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তোলা। সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা ও অবকাঠামো অর্থায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা বাড়বে এবং ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমবে—এমনটাই প্রত্যাশা সরকারের।