মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সারা দেশে শুরু হয়েছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) থেকে কার্যকর হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা চলবে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময়ে দেশের কোথাও ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় করা যাবে না।

প্রধান প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মা ইলিশ রক্ষা এবং ভবিষ্যতে মাছটির উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ইলিশ সম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভায় নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করা হয়।

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা মাছ নদীতে এসে ডিম ছাড়ে। এ সময়ে মাছ ধরা অব্যাহত থাকলে বিপুলসংখ্যক প্রজননক্ষম ইলিশ আহরিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাছ ধরা বন্ধ রেখে মা ইলিশের প্রজননের সুযোগ নিশ্চিত করতে চায় মৎস্য বিভাগ।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার অভয়াশ্রম। পাশাপাশি বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ প্রজনন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

চাঁদপুরে নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর থেকেই নদী ও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে মাছ ধরার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অনেক জেলে নৌকা তীরে তুলে রেখেছেন। কেউ নৌকা মেরামত করছেন, আবার কেউ জাল ঠিক করার কাজে সময় কাটাচ্ছেন।

নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিনে চাঁদপুরের বড় স্টেশন তিন নদীর মোহনা, টিলাবাড়ী ও লঞ্চঘাট এলাকায় মাছ ধরার নৌকার উপস্থিতি ছিল না। স্থানীয় জেলে সংগঠনের পক্ষ থেকেও মাইকিং করে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইলিশ সংরক্ষণে জেলা ও উপজেলা টাস্কফোর্স নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরতে নদীতে নামলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ এর আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকায় নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেন। জেলা প্রশাসন, নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড এবং মৎস্য অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নৌযান ও সরঞ্জাম ব্যবহারের নির্দেশনাও রয়েছে।

এদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছ ধরতে না পারা নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় খাদ্যসহায়তার ব্যবস্থা করেছে সরকার।

চাঁদপুরে ৪১ হাজার নিবন্ধিত জেলেকে ইতোমধ্যে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ। ঝালকাঠিতে চার হাজার ২০০ জেলে পরিবারের জন্য ১০৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক পরিবার পাচ্ছে ২৫ কেজি করে চাল।

তবে নিষেধাজ্ঞার সময়ে আয় বন্ধ থাকায় জেলে পরিবারগুলোর জীবিকা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। অনেক জেলে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নদীতে অবৈধ মাছ ধরা বন্ধে কার্যকর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মা ইলিশের প্রজননকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর সুফল পেতে নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ ও জেলেদের সহযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সরকারের লক্ষ্য, ২২ দিনের এই সংরক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ ইলিশের উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখা।