দেশের প্রায় দুই কোটি মৎস্যজীবীর জীবন-জীবিকা নিয়ে সুরক্ষার প্রশ্ন

বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এ খাতের বহু শ্রমিকের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা এখনও অনিশ্চিত। তাঁদের শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং জীবিকা হারালে সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচার একটি হোটেলে ‘মৎস্য খাতে শোভন কর্মপরিবেশ: নীতিগত সুপারিশ ও করণীয়’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও ফ্রেডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং (এফইএস) বাংলাদেশ। আলোচনায় মৎস্য শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় নীতি ও আইনি সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

শ্রমিকদের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায়

সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, মৎস্য খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করলেও তাঁদের কর্মসংস্থানের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক। বিলসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রেজোয়ানুল হক আজম জানান, চিংড়ি ও ট্রলার খাতের বাইরে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো নেই। অনেক শ্রমিকের নিয়োগপত্র, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীও নেই। ফলে তাঁরা শ্রম অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মৎস্য খাতের কাজ শুধু নদী বা সাগরে মাছ ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাছ চাষ, আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষ এ খাতের ওপর নির্ভর করেন। তাঁদের মধ্যে নারীরাও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক। বিশেষ করে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চিংড়ি খাতে কাজ করা নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।

মাছ ধরা বন্ধ থাকলে বন্ধ হয়ে যায় আয়

মৎস্যজীবীদের সংকটের অন্যতম দিক হলো মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। মাছের প্রজনন ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়। কিন্তু এ সময়ে বিকল্প কাজ বা পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা না পেলে অনেক পরিবারকে ঋণ কিংবা অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, মৎস্যজীবীদের সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক। নিষেধাজ্ঞার সময় উপার্জন বন্ধ থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নারী শ্রমিকদের কাজ করা এবং জীবিকার তাগিদে মাছ ধরতে গিয়ে জেল-জরিমানার মুখে পড়ার মতো পরিস্থিতি তাঁদের দুর্দশা বাড়ায়। তিনি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়ন এবং হাওর, নদী ও সমুদ্রের জেলেদের জন্য পৃথক নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

এ ছাড়া নদীভাঙন, উপকূলীয় পরিবেশের পরিবর্তন ও মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও অনেক পরিবারের জীবিকায় চাপ তৈরি করছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের উপকূলীয় ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের জীবিকা অনিশ্চয়তার সঙ্গে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, বিকল্প আয়ের অভাব এবং মাছ ধরার এলাকায় প্রবেশের সীমাবদ্ধতার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

শ্রম আইনের আওতায় আনার দাবি

সংলাপে মৎস্য শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সব ধরনের মৎস্য শ্রমিককে শ্রম আইনের আওতায় আনা, তাঁদের নিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর তদারকি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে আলোচনায় উঠে আসে।

কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসেবা এবং দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নদী ও সমুদ্রে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার এবং নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তাব রয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রস্তাব

মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি, রেশনিং সুবিধা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ এবং সহজ শর্তে আর্থিক সেবা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। মাছ ধরা বন্ধের মৌসুমে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নদীতীরবর্তী শ্রমজীবী মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধানও প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের ঋণ, ভর্তুকি ও সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধার কথা উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে স্থানীয় মৎস্যজীবী সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং নীতিনির্ধারণে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

জীবিকা রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন

মৎস্য খাতের টেকসই উন্নয়ন শুধু মাছের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে না। এ খাতের শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত না হলে জীবিকা হারানোর চাপ তাঁদের আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

জাতীয় সংলাপে উত্থাপিত সুপারিশগুলোর লক্ষ্য হলো মৎস্য শ্রমিকদের শ্রম অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, শ্রমিক সংগঠন ও মৎস্য খাতের অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত এই খাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।