দেশের নদী, হাওর, বাঁওড়, খাল ও সমুদ্র উপকূলীয় জলাশয়ে মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ উদ্যোগের পাশাপাশি বিপন্ন প্রজাতির মাছ ফিরিয়ে আনা, জলাশয়ের পরিবেশ উন্নত করা এবং ক্ষতিকর মাছ ধরার জাল ব্যবহার বন্ধে গবেষণা ও আইন প্রয়োগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশীদ বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব পরিকল্পনার কথা জানান। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) আয়োজিত ‘বার্ষিক গবেষণা অগ্রগতি পর্যালোচনা ২০২৫-২৬ ও গবেষণা পরিকল্পনা ২০২৬-২৭’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি বলেন, প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের উৎপাদন বাড়াতে দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে অভয়াশ্রম গড়ে তোলার বড় পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

বাসস ও দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় এ বছর মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে বড় পরিসরের পরিকল্পনা ও বাজেট নিয়ে কাজ করছে সরকার। তবে নতুন অভয়াশ্রমের নির্দিষ্ট সংখ্যা, স্থান ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হারাচ্ছে দেশীয় মাছ

মৎস্যমন্ত্রী বলেন, একসময় বাংলাদেশে ৩০০টিরও বেশি প্রজাতির দেশীয় স্বাদুপানির মাছ পাওয়া যেত। আবাসস্থল ধ্বংস, অতিরিক্ত মাছ শিকার, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব প্রজাতির অনেকগুলো হারিয়ে গেছে। আরও কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাসসের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৬৪টি স্বাদুপানির মাছের প্রজাতি সংকটাপন্ন থেকে মহাবিপন্ন বিভিন্ন শ্রেণিতে রয়েছে। গত ৩০ থেকে ৪০ বছরে ৩০টি প্রজাতি প্রাকৃতিক পরিবেশে বিলুপ্ত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নদী ও অন্যান্য জলাশয়ের প্রবাহ কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় দখল এবং পলি জমে ভরাট হওয়ার কারণে মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। ফলে মাছের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত স্থান, পোনা বেড়ে ওঠার পরিবেশ এবং নিরাপদ আশ্রয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ ধরা হলে শুধু বর্তমান মাছের মজুতই কমে না, পরবর্তী প্রজন্মের মাছের সংখ্যাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে নির্দিষ্ট জলাশয় বা নদীর অংশকে অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণ করে সেখানে মাছের বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অভয়াশ্রমে মাছ ধরায় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা

মাছের অভয়াশ্রম বলতে এমন নির্দিষ্ট জলজ এলাকাকে বোঝায়, যেখানে মাছের নিরাপদ বিচরণ, প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জন্য বিশেষ সংরক্ষণব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী মাছ ধরা নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়, যাতে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত না হয়।

এর আগে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে মৎস্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, নদী, বিল ও খালে মাছের অভয়াশ্রম নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। হাওর, বিল ও খালসহ বিভিন্ন স্বাদুপানির জলাশয়ে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

গত ৮ আগস্ট মন্ত্রী হাওর ও জলাভূমিতে নতুন অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং জলমহাল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনার কথাও জানান। প্রচলিত ইজারা ব্যবস্থার পরিবর্তে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ চলছে বলে সে সময় তিনি উল্লেখ করেন।

নতুন পরিকল্পনায় এসব উদ্যোগ কতটা সম্প্রসারিত হবে, তা নির্ভর করবে নির্দিষ্ট কর্মসূচি, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ওপর। অভয়াশ্রম ঘোষণার পাশাপাশি সেখানে নিয়মিত নজরদারি এবং প্রজনন মৌসুমে আইন কার্যকর করাও প্রয়োজন।

গবেষণায় ফিরছে হারিয়ে যাওয়া মাছ

দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য সংরক্ষণে গবেষণার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন মৎস্যমন্ত্রী। তিনি গবেষকদের মাছের প্রজনন, উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং বিপন্ন দেশীয় প্রজাতি পুনরুদ্ধারে আরও মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা, মাছের রোগ প্রতিরোধ এবং মানসম্মত পোনা উৎপাদনেও গবেষণা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া ৬৭টি প্রজাতির মধ্যে ৩৭টি প্রজাতি বন্দী প্রজনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণে গবেষণার সম্ভাবনা তুলে ধরে।

তবে গবেষণাগারে প্রজনন করিয়ে মাছের পোনা উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ে স্থায়ীভাবে কোনো প্রজাতির বিস্তার নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। মাছের জন্য উপযুক্ত পানি, খাবার, আশ্রয় ও প্রজননক্ষেত্র বজায় রাখা না গেলে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সফল নাও হতে পারে।

দূষণ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব

কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পানির গুণগত মান বজায় রাখা জরুরি। জলাশয়ের দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং মাছের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

প্রতিমন্ত্রী নদী ও খাল খননের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ বাড়ানো এবং জলাবদ্ধতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। তাঁর মতে, পানির পরিবেশ ভালো থাকলে মাছের স্বাদ ও গুণগত মান বজায় রাখতেও সুবিধা হয়।

এ ছাড়া উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগানো, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধে আইন প্রয়োগ এবং মাছের খাদ্যে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার না করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্য

বাংলাদেশে চাষের মাছের উৎপাদন, মাছের গুণগত মান এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে কর্মশালায় উল্লেখ করেন মৎস্যমন্ত্রী। তবে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু চাষের মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে দেশীয় প্রজাতির বৈচিত্র্য রক্ষা করা কঠিন হবে।

এ কারণে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, দূষণ কমানো, অবৈধ দখল বন্ধ এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। স্থানীয় জেলে ও জলাশয়নির্ভর জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করাও এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে।

সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে অভয়াশ্রমের যথাযথ স্থান নির্বাচন, নিয়মিত তদারকি, গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ এবং জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষায় ধারাবাহিক পদক্ষেপের ওপর।