দেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে আরও ছয় কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার প্রস্তাবে সুপারিশ করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এর মধ্যে পাঁচ কার্গো কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিপি সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে। বাকি এক কার্গো কেনা হবে কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসির কাছ থেকে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত কমিটির ২০২৬ সালের ৫১তম সভায় প্রস্তাব দুটি নিয়ে আলোচনা হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ভার্চ্যুয়ালি সভায় সভাপতিত্ব করেন। রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এ খবর জানিয়েছে।

বিপি সিঙ্গাপুর থেকে পাঁচ কার্গো

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বিপি সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে পাঁচ কার্গো এলএনজি সংগ্রহ করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) গ্যাসের দাম জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকের তুলনায় ১৭ সেন্ট কম রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

জেকেএম হলো এশিয়ার বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বহুল ব্যবহৃত মূল্যসূচক। এ সূচকের সঙ্গে দাম সমন্বয় করে কেনাকাটার ফলে প্রকৃত ক্রয়মূল্য বাজারদরের ওঠানামার সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে সূচকের চেয়ে কম দামে কেনার প্রস্তাব থাকলেও মোট ব্যয় নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সময়ে জেকেএমের দর এবং কেনা গ্যাসের পরিমাণের ওপর।

প্রস্তাবে প্রয়োজন হলে দুই পক্ষের সম্মতিতে অতিরিক্ত কার্গো কেনার সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে বিপি সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে পাঁচ কার্গো সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং এ কেনাকাটায় মোট কত ব্যয় হবে, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।

কাতার থেকে আসবে আরও এক কার্গো

কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসির কাছ থেকে একটি অতিরিক্ত কার্গো কেনার প্রস্তাবও সুপারিশ করেছে কমিটি। এটি বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, কার্গোটির সরবরাহের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ ডিসেম্বর ২০২৬। এ চালানের ক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম জেকেএম সূচকের চেয়ে ১০ সেন্ট কম রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে এটি বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে উল্লেখ করা দরের থেকে ভিন্ন মূল্যব্যবস্থার আওতায় কেনা হবে।

গ্যাসের সংকটে কতটা স্বস্তি মিলবে

ছয় কার্গো এলএনজি কেনার উদ্যোগ দেশের গ্যাস সরবরাহে অতিরিক্ত জোগান নিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপ। তবে শুধু কেনাকাটার প্রস্তাব অনুমোদন বা সুপারিশ হলেই গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের সরবরাহ বেড়ে যায় না। আমদানি করা গ্যাস দেশে পৌঁছানো, তা পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর এবং জাতীয় সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যকরভাবে সম্পন্ন হতে হয়।

শিল্পকারখানায় উৎপাদন সচল রাখা, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করা এবং আবাসিক গ্রাহকদের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ভূমিকা রয়েছে। নতুন কার্গোগুলোর সরবরাহের সময়সূচি, দৈনিক গ্যাস সরবরাহে সম্ভাব্য সংযোজন এবং বিভিন্ন খাতে বণ্টনের তথ্য পাওয়া গেলে সংকট কমাতে এ উদ্যোগের প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।

তবে প্রকাশিত সিদ্ধান্তে ছয় কার্গো যুক্ত হওয়ার পর দেশে দৈনিক কত ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়বে, কিংবা শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকেরা কতটা স্বস্তি পাবেন, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি। তাই সরবরাহের বাস্তব অগ্রগতি না দেখে গ্যাসসংকটের উল্লেখযোগ্য সমাধান হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

জাপানি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত নয়

এদিকে জাপানের জেরা গ্লোবাল মার্কেটস পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে সরাসরি এলএনজি কেনার আরেকটি প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। পেট্রোবাংলা ও প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে স্বল্পমেয়াদি এলএনজি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি চূড়ান্ত করার বিষয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়।

তবে এ প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আইন ও সংসদবিষয়ক বিভাগের যাচাই সম্পন্ন করে পরবর্তী সভায় বিষয়টি উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস। ফলে জেরা গ্লোবাল মার্কেটসের কাছ থেকে কত কার্গো এলএনজি কেনা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে, বিপি সিঙ্গাপুর ও কাতার এনার্জি ট্রেডিংয়ের কাছ থেকে ছয় কার্গো এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ দেশের জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ। এখন নজর থাকবে কার্গোগুলোর সরবরাহ কবে সম্পন্ন হয়, আমদানি ব্যয় কত দাঁড়ায় এবং বাড়তি গ্যাসের জোগান বাস্তবে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালি পর্যায়ে কতটা কাজে আসে তার ওপর।