দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়নসহ সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর প্রত্যাশা, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দুই বছরে অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে এবং পরবর্তী তিন বছরে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে টেকসই বিনিয়োগবিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর তাৎক্ষণিক সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বাস্তবসম্মত হবে না। সরকারের পরিকল্পনায় প্রথম দুই বছর অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা অর্জনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এরপর তৃতীয় বছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে পূর্ণমাত্রায় পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য রয়েছে।

বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এখন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগের সময়ের আর্থিক দায় যুক্ত হওয়ায় সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে।

ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, দেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কমানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য দুটি পৃথক সংস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি খাতে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, দেশীয় গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধানে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) ৫০টি নতুন কূপ খননের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধানের জন্য উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে তিনি জানান, সরকার অন্তত ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুতের অবকাঠামোর ওপর কর ছাড় দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর দাবি, অতীতের আর্থিক অনিয়ম ও বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে দেশের আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বর্তমানে ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ১৬ জন বিনিয়োগকারীর একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত, বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এসব আলোচনা থেকে কত অর্থ বাস্তবে বিনিয়োগ হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়।

অনুষ্ঠানে এফআইসিসিআইয়ের সভাপতি রূপালী চৌধুরী স্বাগত বক্তব্য দেন। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং দেশি-বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নেন।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সরকারের সামনে দুই বছরের একটি প্রাথমিক লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের ওপর।