দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন কারখানার উৎপাদন থেকে কর্মসংস্থান পর্যন্ত চাপ তৈরি করছে। শিল্প পুলিশের সর্বশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, তাদের আওতাধীন ১০ হাজার ৬৩টি কারখানার মধ্যে অন্তত ৪১৩টি গ্যাস, বিদ্যুৎ অথবা দুই ধরনের সংকটেই উৎপাদন সমস্যায় পড়েছে। পরিস্থিতি একইভাবে চললে এর মধ্যে ২০২টি কারখানা আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
শিল্প পুলিশের আটটি ইউনিট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন তৈরি হয়েছে। আক্রান্ত কারখানাগুলো গাজীপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট ও ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানার পাশাপাশি সিরামিক, সাবানসহ অন্য উৎপাদন খাতও এই তালিকায় রয়েছে।
৪১৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯৫টি একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। আরও ১১৫টি প্রতিষ্ঠান মূলত গ্যাসের সমস্যায় পড়েছে। সংকটের প্রভাবে ১৫০টির বেশি কারখানায় স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ১০ থেকে ৫০ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে বলে শিল্প পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গত ২১ জুলাই থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়। ওই সময় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায় বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল। শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্য গ্রাহকের কাছে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই বিপর্যয়।
শিল্প পুলিশের হিসাবে, সংকট শুরু হওয়ার পর ১৭টি কারখানার ১৮টি উৎপাদন ইউনিট ইতোমধ্যে কার্যক্রম স্থগিত করেছে। আরও দুটি প্রতিষ্ঠানে আংশিক বন্ধ বা কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত এসেছে। তবে সব ক্ষেত্রেই শুধু গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংকট একমাত্র কারণ নয়। আর্থিক সমস্যা, ব্যাংকিং জটিলতা এবং বকেয়া বিলের কারণে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও কিছু প্রতিষ্ঠানে রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে গ্যাসনির্ভর বস্ত্র ও ভারী উৎপাদন খাত। স্পিনিং, ডাইং, ওয়াশিং, নিট কম্পোজিট ও সিরামিক কারখানায় নির্দিষ্ট মাত্রার গ্যাসচাপ ছাড়া উৎপাদন চালানো কঠিন। অনেক প্রতিষ্ঠান তাই ডিজেল জেনারেটর, বিকল্প জ্বালানি বা সীমিত শিফটে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও ক্রেতাদের কাছ থেকে একই অনুপাতে বাড়তি দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
গাজীপুরে সংকটের প্রভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান। শিল্প পুলিশের স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, অনেক কারখানার উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর আগে শিল্প ও তিতাস গ্যাস সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের শিল্প খাতে দৈনিক প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও একপর্যায়ে সরবরাহ ছিল প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
গাজীপুরের অনেক পোশাক কারখানা সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও তাদের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে কাজ করা স্পিনিং, নিটিং, ডাইং ও ফিনিশিং ইউনিটগুলো গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ফলে একটি পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে শুধু সেই কারখানা নয়, পুরো পোশাক রপ্তানি শৃঙ্খলেই এর প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন সময়সূচি বদলানো, অতিরিক্ত শিফট চালানো এবং ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, উৎপাদন দীর্ঘ সময় কম থাকলে কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়মিত মজুরি পরিশোধে সমস্যায় পড়তে পারে। বছরের শেষ দিকে শ্রমিকদের মূল মজুরিতে বাধ্যতামূলক ৯ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধির অর্থ জোগাড় করাও দুর্বল কারখানাগুলোর জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে তাদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
চট্টগ্রামে রপ্তানি সময়সূচি নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে। শিল্প পুলিশের স্থানীয় ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৬টি কারখানা তাদের নির্ধারিত রপ্তানি চালানের অর্ধেক পর্যন্ত সময়মতো সম্পন্ন করতে সমস্যায় পড়ছিল। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে, কারণ বড় প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সক্ষমতা অনেকের নেই।
বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারাও সংকটের বড় প্রভাবের কথা জানিয়ে আসছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল আগস্টের শেষ সপ্তাহে দাবি করেছিলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে প্রায় ৬০০ বস্ত্র কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, শুধু জ্বালানি সংকটের কারণে ঠিক কতটি কারখানা বন্ধ হয়েছে, তার পৃথক যাচাইকৃত সংখ্যা তখন সংগঠনটির হাতে ছিল না। এ কারণেই শিল্প পুলিশের ৪১৩ কারখানার হিসাবটিকে নির্দিষ্ট সময় ও তাদের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রেও সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, সংগঠনের প্রায় ২ হাজার সদস্য কারখানা কোনো না কোনোভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যায় পড়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কমেছে বা বিকল্প ব্যবস্থায় কাজ চালানো হচ্ছে।
শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসীম উদ্দিনও পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, উৎপাদন কমলেও এখন পর্যন্ত জ্বালানি সংকটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার সংখ্যা তুলনামূলক কম। অনেক প্রতিষ্ঠান জেনারেটর বা অন্য বিকল্প ব্যবস্থায় সীমিত উৎপাদন চালু রেখেছে, ফলে এখনই ব্যাপক হারে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এমনটি তিনি মনে করছেন না। তবে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রম অসন্তোষের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
এর মধ্যেই কিছু প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের ওপর চাপ দেখা যাচ্ছে। গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে কেয়া গ্রুপের কয়েকটি ইউনিটে ৮ সেপ্টেম্বর ৬২৭ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়। প্রতিষ্ঠানের নোটিশে ব্যাংকিং সমস্যা, বকেয়া বিলের কারণে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং উৎপাদন ও প্রশাসনিক খরচ কমানোর প্রয়োজনকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ওই ছাঁটাইকে শুধু জাতীয় গ্যাস সংকটের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
সিরামিক খাতেও সংকট তীব্র। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত শিল্প সংশ্লিষ্ট তথ্যে দেখা যায়, ৩০টির বেশি সিরামিক কারখানা গুরুতর গ্যাস সরবরাহ সমস্যায় পড়েছে এবং খাতটির সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। উচ্চ তাপমাত্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে চুল্লি চালাতে হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ওঠানামা এই শিল্পের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ।
সরকার অবশ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানোর কথা বলছে। ৩ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা তখন প্রায় ৮৮ শতাংশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল এবং বাকি অংশও স্বাভাবিক করার কাজ চলছিল। তিনি দুই সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির আশা প্রকাশ করেছিলেন।
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারি ও বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ফলে কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে সরকার আশা করছে। এর আগে ১৫ আগস্ট পেট্রোবাংলা জানিয়েছিল, জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২ হাজার ৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল, যার ৮২৮ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরিত আমদানিকৃত এলএনজি।
তবে বিদ্যুৎ খাতেও নতুন অনিশ্চয়তা রয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের গড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে ওই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। একই সময়ে দেশের গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদনে সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কার্যকর বিকল্প সক্ষমতাও কম রয়েছে।
ফলে শিল্প পুলিশের মূল্যায়নের ২০২টি কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকার শর্তে করা একটি ঝুঁকি মূল্যায়ন। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বাড়াতে পারবে। কিন্তু গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় থাকলে উৎপাদন কমে যাওয়া, রপ্তানি বিলম্ব, বাড়তি খরচ এবং শ্রমিকদের মজুরি ও চাকরির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
